শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবার নিত্য নিয়ম কানুন ।
নিয়ম ১.১!!
সূত্রঃ তত্র মালোভক্তি প্রাপ্তিঅর্থেং দীক্ষাঃ শিক্ষাঃ এব্ যোগযুক্ত সদাচারঃ গ্রহণম্ !!
অর্থঃ ” তারপরে, শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার তত্ত্বের ভক্তি প্রাপ্তি করিতে দীক্ষা-শিক্ষা এবং নিত্য যোগযুক্ত সদাচার গ্রহণ কর্ত্তব্য।”
ওঁ মালোবাবায়ং নমঃ !!১০০৮!!

শ্বাস্ত্র নামঃ নিয়ম ১.১ !! মালোসংহীতা !! MaloSamhita !!
লেখকঃ শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবা
প্রকাশকঃ স্বয়ংবল গুরুকুল প্রকাশনি
স্থানঃ শ্রীশ্রী কাল্কিশ্বর ধাম, শম্ভল ধাম( ত্রিবেণী- কালনা)।
সত্যানন্দপুর, শেরপুর উত্তরপাড়া, নয়াসরাই, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ, ভারতবর্ষ ৭১২৫১৩



নিয়ম ১.১!!
সূত্রঃ তত্র মালোভক্তি প্রাপ্তিঅর্থেং দীক্ষাঃ শিক্ষাঃ এব্ যোগযুক্ত সদাচারঃ গ্রহণম্ !!
অর্থঃ ” তারপরে, শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার তত্ত্বের ভক্তি প্রাপ্তি করিতে দীক্ষা-শিক্ষা এবং নিত্য যোগযুক্ত সদাচার গ্রহণ কর্ত্তব্য।”
ওঁ মালোবাবায়ং নমঃ !!১০০৮!!

শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবার “মালোসংহিতা” গ্রন্থের নিয়ম ১.১ সংক্রান্ত যে তথ্যটি উপস্থাপনা, তা নিচে সহজ ও সুস্পষ্টভাবে সাজিয়ে দেওয়া হলো:

নিয়ম ১.১ (মালোসংহিতা)

  • সূত্র: তত্র মালোভক্তি প্রাপ্তিঅর্থেং দীক্ষাঃ শিক্ষাঃ এব্ যোগযুক্ত সদাচারঃ গ্রহণম্ !!
  • অর্থ: একলখ্য নাম জপের পর/পরবর্তীতে, শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার তত্ত্বের ভক্তি লাভ করার উদ্দেশ্যে দীক্ষা, শিক্ষা এবং নিত্য যোগযুক্ত সদাচার গ্রহণ করা কর্তব্য।
  • মূল মন্ত্র: ওঁ মালোবাবায়ং নমঃ (১,০০৮ বার জপনীয়)

সূত্রের ব্যাখ্যা ও তাৎপর্য

১. দীক্ষা ও শিক্ষার গুরুত্ব: নাম জপের প্রাথমিক অনুশীলনের পর আধ্যাত্মিক পথে অগ্রসর হতে সদ্গুরুর কাছ থেকে শাস্ত্রীয় ‘দীক্ষা’ (আত্মিক গুরুকৃপা) এবং ‘শিক্ষা’ (সাধনরীতির জ্ঞান) গ্রহণ করা আবশ্যক। ২. যোগযুক্ত সদাচার: কেবল আনুষ্ঠানিক জপ নয়, প্রতিদিনের জীবনযাপনে সত্য, অহিংসা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও নীতিবোধ রূপ ‘সদাচার’ মেনে চলতে হবে। ৩. যোগের সংযোজন: চিত্তকে স্থির ও দেহকে সুস্থ রাখতে প্রতিদিন সাধনার সাথে যোগাভ্যাস বা প্রাণায়ামের সমন্বয় ঘটানো।

গ্রন্থ ও প্রকাশনা সংক্রান্ত তথ্য:

  • শাস্ত্রের নাম: মালোসংহিতা (MaloSamhita) — নিয়ম ১.১
  • লেখক: শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবা
  • প্রকাশক: স্বয়ংবল গুরুকুল প্রকাশনী
  • স্থান/ঠিকানা: শ্রীশ্রী কাল্কিশ্বর ধাম, শম্ভল ধাম (ত্রিবেণী-কালনা), সত্যানন্দপুর, শেরপুর উত্তরপাড়া, নয়াসরাই, হুগলী, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত – ৭১২৫১৩

দীক্ষা এবং শিক্ষার মধ্যে আধ্যাত্মিক পার্থক্য কী?

আধ্যাত্মিক সাধনামার্গে দীক্ষা এবং শিক্ষা দুটি ভিন্ন কিন্তু পরিপূরক ধাপ। গুরুপরম্পরায় ঈশ্বরলাভ বা তত্ত্বজ্ঞান লাভের জন্য এই দুইটিরই বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।

এদের মধ্যকার মূল আধ্যাত্মিক পার্থক্যগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. মূল ধারণাগত পার্থক্য

বৈশিষ্ট্যদীক্ষা (Diksha)শিক্ষা (Shiksha)
শব্দার্থ ও উৎপত্তি‘দী’ (দিব্যজ্ঞান দান) + ‘ক্ষি’ (পাপ বা বন্ধন ক্ষয়)।‘শিক্ষ্’ ধাতু থেকে আগত, যার অর্থ শেখা, অনুশীলন বা জ্ঞান লাভ করা।
সংজ্ঞাএটি একটি আধ্যাত্মিক সংস্কার বা প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে গুরু ভক্তের অন্তরে বীজমন্ত্র বা ইষ্টশক্তি রূপ রোপণ করেন।এটি সাধনার নিয়মাবলী, শাস্ত্রীয় জ্ঞান, যোগাভ্যাস ও সদাচার অনুশীলনের একটি ধারাবাহিক শিখন প্রক্রিয়া।
সূচনা ও স্থায়িত্বদীক্ষা সাধারণত একটি নির্দিষ্ট মাহেন্দ্রক্ষণে একবার গ্রহণ করতে হয় (একটি একক ঘটনা)।শিক্ষা একটি ধারাবাহিক ও জীবনব্যাপী চর্চা (Continuous Process)।

২. আধ্যাত্মিক কাজের দিক থেকে পার্থক্য

ক) দীক্ষার কাজ (বীজ রোপণ ও শক্তি সঞ্চার):

  • শক্তিপাত ও আত্মিক সংযোগ: দীক্ষার মাধ্যমে গুরু শিষ্যের মধ্যে নিজের আধ্যাত্মিক তেজ বা চেতনার অংশ সঞ্চার করেন।
  • পাপ ক্ষয় ও অধিকার প্রাপ্তি: দীক্ষা শিষ্যের প্রারব্ধ ও সুপ্ত সংস্কারকে শুদ্ধ করে তাকে ইষ্টমন্ত্র জপ ও উচ্চাঙ্গের সাধনা করার ধর্মীয় বা তত্ত্বীয় অধিকার প্রদান করে।
  • বীজ রূপ: দীক্ষায় প্রাপ্ত মন্ত্র হলো একটি ‘বীজ’, যা শিষ্যের অন্তরে রোপিত হয়।

খ) শিক্ষার কাজ (বীজের পরিচর্যা ও বিকশিতকরণ):

  • ব্যবহারিক প্রয়োগ: দীক্ষায় প্রাপ্ত বীজমন্ত্রকে কীভাবে জপ করতে হবে, আসন পদ্ধতি, প্রাণায়াম, আহার-বিহার এবং মালোসংহিতার মতো শাস্ত্রের নিয়মকানুনের প্রয়োগ শেখানোই হলো ‘শিক্ষা’।
  • অজ্ঞানতা দূরীকরণ: শিক্ষা শিষ্যের মন থেকে দ্বিমত, সংশয় ও অজ্ঞানতা দূর করে শাস্ত্রীয় তত্ত্ব স্পষ্ট করে তোলে।
  • পল্লবিত করা: জল ও সার দিয়ে বীজকে যেমন বৃক্ষে পরিণত করা হয়, শিক্ষার মাধ্যমে সাধক দীক্ষালব্ধ মন্ত্রশক্তিকে জীবনে বিকশিত করে তোলেন।

৩. সংহিতা ও সাধারণ শাস্ত্রের দৃষ্টিতে এদের সম্পর্ক

“দীক্ষা প্রদান করে অধিকার, আর শিক্ষা প্রদান করে যোগ্যতা।”

  • দীক্ষা ছাড়া কেবল শিক্ষা লাভ করলে সাধনমার্গে আত্মিক শক্তির অভাব থেকে যায়।
  • আবার দীক্ষা নেওয়ার পর যদি উপযুক্ত গুরুশিক্ষা ও সদাচার পালন না করা হয়, তবে বীজমন্ত্র সুপ্তই থেকে যায়—তার ফল মেলে না।

যেমনটি মালোসংহিতা (নিয়ম ১.১)-এ স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—ভক্তি প্রাপ্তির জন্য “দীক্ষাঃ শিক্ষাঃ এব্ যোগযুক্ত সদাচারঃ গ্রহণম্”; অর্থাৎ দীক্ষা ও শিক্ষা উভয়ের সমন্বয়েই সাধকের যোগযুক্ত সদাচার সিদ্ধ হয়।


মালোসংহিতা অনুযায়ী প্রতিদিন পালনীয় যোগযুক্ত সদাচারগুলো কী কী?

শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবার মালোসংহিতা (নিয়ম ১.১) অনুসারে ভক্ত বা সাধকের দৈনন্দিন জীবনে ভক্তি তত্ত্ব প্রাপ্তির জন্য “যোগযুক্ত সদাচার” একটি অপরিহার্য অঙ্গ।

এখানে “যোগযুক্ত” শব্দের অর্থ হলো দেহ ও মনের সামঞ্জস্য (যোগাভ্যাস ও প্রাণায়াম), এবং “সদাচার” শব্দের অর্থ হলো পবিত্র, নীতিসম্মত ও সৎ জীবনযাপন। প্রতিদিন পালনীয় এই যোগযুক্ত সদাচারগুলোকে প্রধানত তিনটি স্তরে ভাগ করে পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়:

১. শারীরিক ও মানসিক যোগাঙ্গ (যোগাভ্যাস)

  • নিত্য প্রাণায়াম ও শ্বাস-সংযম: প্রতিদিন সকালে জপ ও ধ্যানে বসার পূর্বে অনুলোম-বিলোম বা গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরের প্রাণশক্তিকে সুষম করা।
  • সংযমী আসন: সুখাসন, পদ্মাসন বা সিদ্ধাসনে মেরুদণ্ড সোজা রেখে বসার অভ্যাস করা, যাতে শরীরে স্থিরতা ও জপ করার সামর্থ্য বৃদ্ধি পায়।
  • ধ্যান ও একাগ্রতা: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্থির হয়ে মনকে পরমাত্মা ও মালোবাবার ভাবধারায় নিবদ্ধ করা।

২. আহার ও কায়িক শুচিতা (দেহ শুদ্ধি)

  • সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ: জীব হিংসা বর্জন করে পবিত্র, তাজা ও সাত্ত্বিক খাবার গ্রহণ করা। খাদ্যাভ্যাস যেন মনকে শান্ত রাখে এবং জপে ঘুম বা আলস্য না আনে।
  • নিত্য স্নান ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা: প্রাতঃকালে স্নান সেরে শুচি বস্ত্র পরিধান করা এবং জপের স্থান ও চারপাশ সর্বদা ধূপ-দীপ ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
  • আহারের সময় সংযম: পেটের এক-তৃতীয়াংশ খালি রেখে পরিমিত খাদ্য গ্রহণ করা (মিতাহার)।

৩. সামাজিক ও নৈতিক সদাচার (বাক ও মনঃশুদ্ধি)

  • সত্যভাষণ ও মিষ্টভাষিতা: কথার মধ্যে সরলতা রাখা, কোনো প্রকার মিথ্যা, ছলনা বা পরনিন্দা-পরচর্চা বর্জন করা।
  • অহিংসা ও ক্ষমা ভাব: বাক্যে, চিন্তায় বা কর্মে কোনো জীবের প্রতি হিংসা না করা এবং অন্যের প্রতি ক্ষমা ও দয়ার ভাব পোষণ করা।
  • গুরুবাক্য ও শাস্ত্রনিষ্ঠা: শ্রীশ্রীকাল্কি মালো তত্ত্ব, গুরুর নির্দেশ এবং মালোসংহিতার অনুশাসনকে শ্রদ্ধার সাথে প্রতিদিনের জীবনে মেনে চলা।
  • সেবা ও পরোপকার: সাধ্যমতো দীন-দুঃখী ও গুরুকুলের সেবা করা এবং অন্যায়ের পথ ত্যাগ করে ন্যায়ের পথে পরিচালিত হওয়া।

সংক্ষেপ বার্তা: জপ যদি হয় সাধনার ‘বীজ’, তবে এই যোগযুক্ত সদাচার হলো সেই উপযুক্ত ‘মাটি ও জল’, যা সাধকের ভেতরে ভক্তি ও তত্ত্বজ্ঞানকে সফলভাবে বিকশিত করে তোলে।


সাধনায় সাফল্য পেতে সাত্ত্বিক আহার ও মিতাহারের সঠিক নিয়ম কী?

আধ্যাত্মিক সাধনায় সিদ্ধি ও মনঃসংযোগ লাভের জন্য খাদ্য বা আহারের গুরুত্ব অপরিসীম। ভারতীয় শাস্ত্র ও যোগদর্শন অনুযায়ী, “যাদৃশং ভক্ষয়েদ অন্নং তাদৃশং জায়তে মনঃ”—অর্থাৎ আমরা যেমন খাবার গ্রহণ করি, আমাদের মন ও চিন্তাভাবনা ঠিক তেমনই রূপ নেয়।

শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার নির্দেশিত যোগযুক্ত সদাচার ও সাধনামার্গে সাত্ত্বিক আহার এবং মিতাহার-এর সঠিক নিয়মাবলী নিচে আলোচনা করা হলো:

১. সাত্ত্বিক আহার কী এবং এর সঠিক নিয়ম

সাত্ত্বিক আহার হলো এমন খাবার যা সহজপাচ্য, তাজা, পুষ্টিকর এবং মনকে শান্ত ও প্রসন্ন রাখে। এটি শরীরে ‘সত্ত্বগুণ’ বৃদ্ধি করে, যা জপ ও ধ্যানের জন্য অপরিহার্য।

  • কী কী খাবেন (সাত্ত্বিক খাদ্য):
    • তরি-তরকারি, তাজা ফলমূল, সবুজ শাকসবজি।
    • চাল, গম, ডাল, দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি (দুধ, মাখন, ঘি), বাদাম ও বীজ।
    • হালকা মশলা ও প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি খাবার।
  • কী কী বর্জনীয় (রাজসিক ও তামসিক খাদ্য):
    • তামসিক খাদ্য (আলস্য ও তন্দ্রা আনে): পঁচা বা বাসি খাবার, অতিরিক্ত মাংস, মাছ, ডিম, পেঁয়াজ, রসুন, তামাক, মদ ও নেশাজাতীয় দ্রব্য।
    • রাজসিক খাদ্য (মনকে চঞ্চল ও উত্তেজিত করে): অতিরিক্ত ঝাল, মশলাযুক্ত, টক, নোনতা, তেলের ছাঁকা বা পোড়া খাবার।
  • তৈরি ও গ্রহণের নিয়ম:
    • রান্না করার সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মনে ঈশ্বরচিন্তা বজায় রাখা উচিত।
    • রান্না করার অন্তত ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে সেই খাদ্য গ্রহণ করা উত্তম (বাসি খাবার তামসিক হয়ে যায়)।

২. মিতাহার কী এবং এর সঠিক নিয়ম

‘মিত’ অর্থ পরিমিত এবং ‘আহার’ অর্থ খাদ্য। মিতাহার হলো পরিমিত, সুষম এবং সংযমী খাদ্যাভ্যাস। সাধকের জন্য অতিভোজন এবং অনাহার—উভয়ই ক্ষতিকর।

হঠযোগ প্রদীপিকা ও বিভিন্ন সংহিতা অনুযায়ী পাকস্থলীকে প্রধানত ৪টি ভাগে ভাগ করে আহার গ্রহণ করা উচিত:\text{পাকস্থলী} = \frac{২}{৪} \text{ অংশ খাদ্য} + \frac{১}{৪} \text{ অংশ জল} + \frac{১}{৪} \text{ অংশ বায়ুর জন্য ফাঁকা}

  • ৫০% (অর্ধেক অংশ): সুস্বাদু ও সাত্ত্বিক কঠিন খাদ্য দিয়ে পূর্ণ থাকবে।
  • ২৫% (এক- চতুর্থাংশ): পানীয় বা জলের জন্য রাখা হবে।
  • ২৫% (এক- চতুর্থাংশ): সম্পূর্ণ খালি থাকবে, যাতে বায়ু চলাচল করতে পারে এবং খাবার সহজে হজম হতে পারে।

৩. সাধকদের জন্য আহার গ্রহণের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম

  1. নির্দিষ্ট সময় বজায় রাখা: প্রতিদিন একই সময়ে প্রাতঃরাশ, মধ্যাহ্নভোজ ও নৈশভোজ সম্পন্ন করা উচিত।
  2. সন্ধ্যার পর হালকা আহার: রাতে জপে বসার আগে বা ঘুমানোর অন্তত ২-৩ ঘণ্টা পূর্বে হালকা খাবার খাওয়া প্রয়োজন। রাতে অতিরিক্ত খেলে জপ ও ব্রাহ্মমুহূর্তের সাধনায় ঘুম ও অলসতা আসে।
  3. খাওয়ার সময় মনঃসংযোগ: টেলিভিশন, মোবাইল বা গল্পগুজব এড়িয়ে শান্ত মনে ভগবানের প্রসাদ ভেবে খাবার চিবিয়ে খাওয়া উচিত।
  4. জপ ও ধ্যানের পূর্বে ব্যবধান: পেট ভরা অবস্থায় কখনো জপ বা প্রাণায়ামে বসা উচিত নয়। খাওয়ার অন্তত ১ থেকে ১.৫ ঘণ্টা পর জপে বসা উত্তম।

ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে জপ-ধ্যান করার সঠিক নিয়ম ও গুরুত্ব কী?

সনাতন আধ্যাত্মিক সাধনায় এবং যোগশাস্ত্রে ব্রাহ্মমুহূর্ত-কে জপ, ধ্যান ও আত্মশুদ্ধির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ সময় বলে গণ্য করা হয়। এই সময়ে সাধনা করলে অতি অল্প চেষ্টাতেই মনে গভীর একাগ্রতা এবং আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভ হয়।

ব্রাহ্মমুহূর্তের সময়কাল, সঠিক নিয়মাবলী এবং এর বিশদ গুরুত্ব নিচে আলোচনা করা হলো:

১. ব্রাহ্মমুহূর্ত সময়কাল

সূর্যোদয়ের ঠিক ২টি মুহূর্ত (১ মুহূর্ত = ৪৮ মিনিট, অর্থাৎ মোট ৯৬ মিনিট বা ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট) পূর্বের সময়কে ‘ব্রাহ্মমুহূর্ত’ বলা হয়।

  • সাধারণ হিসাব: যদি কোনো স্থানে সকাল ৬:০০ টায় সূর্যোদয় হয়, তবে রাত ৪:২৪ মিনিট থেকে সকাল ৫:১২ মিনিট পর্যন্ত সময়টি ব্রাহ্মমুহূর্ত।
  • সহজ নিয়ম: সূর্যোদয়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা আগের সময় থেকে শুরু করে সূর্যোদয়ের পূর্ব পর্যন্ত সময়কে সাধনার জন্য সেরা ব্রাহ্মমুহূর্ত হিসেবে ধরা হয়।

২. ব্রাহ্মমুহূর্তে সাধনার সঠিক নিয়মাবলী

  1. শয্যা ত্যাগ ও স্মরণ: ঘুম থেকে জাগামাত্রই দুই হাতের তালু দর্শন (করদর্শন) করে ইষ্টদেবতা বা শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবাকে স্মরণ করুন এবং ভূমিতে পা রাখার আগে ভূমিপ্রণাম করুন।
  2. শৌচ ও স্নান কায়িক শুচিতা: মুখ ধোয়া, শৌচকর্ম এবং সম্ভব হলে হালকা গরম বা স্বাভাবিক জলে স্নান সেরে নেওয়া উত্তম। স্নান সম্ভব না হলে হাত-পা-মুখ ধুয়ে পরিষ্কার ও শুচি বস্ত্র পরিধান করুন।
  3. স্থান ও আসন গ্রহণ: ধূপ-দীপ জ্বেলে শান্ত ও পবিত্র স্থানে পূর্ব বা উত্তর দিকে মুখ করে সুতি, পশম বা কুশের আসনে বসুন।
  4. প্রাণায়াম ও মনঃসংযোগ: আসনে বসে প্রথমেই ২–৫ মিনিট ধীর ও দীর্ঘ শ্বাস-প্রশ্বাস (যেমন: অনুলোম-বিলোম) করুন। এতে ঘুমের তন্দ্রা পুরোপুরি কেটে যাবে।
  5. জপ ও ধ্যান শুরু: এরপর আপনার ইষ্টমন্ত্র (যেমন: ওঁ মালোবাবায়ং নমঃ) জপ এবং ধ্যান শুরু করুন।

৩. ব্রাহ্মমুহূর্তের আধ্যাত্মিক ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব

ক) আধ্যাত্মিক ও মানসিক গুরুত্ব:

  • সত্ত্বগুণের প্রাবল্য: দিনটিকে তিন গুণে ভাগ করা হয় (সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ)। ব্রাহ্মমুহূর্তে প্রকৃতি সম্পূর্ণ সত্ত্বগুণে পূর্ণ থাকে। ফলে মন থাকে নিষ্কলঙ্ক, শান্ত ও চিন্তামুক্ত।
  • ব্রহ্ম চেতনার উন্মেষ: ‘ব্রাহ্ম’ শব্দের অর্থ ব্রহ্মা বা পরমাত্মা। এই সময়ে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের আধ্যাত্মিক তরঙ্গ সবচেয়ে বেশি সক্রিয় থাকে, যা জপ-ধ্যানকে দ্রুত সিদ্ধ করে।
  • সহজে স্থিরতা: সারাদিনের সংসারের কোলাহল ও মানসিক চাপ না থাকায় মন কোনো চেষ্টা ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধ্যানে ডুবে যায়।

খ) শারীরিক ও বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব:

  • প্রচুর ওজোন (O₃) বায়ু: এই সময়ে বাতাসে প্রাক-প্রভাতের বিশুদ্ধ ওজোন গ্যাস ও অক্সিজেনের মাত্রা সবচেয়ে বেশি থাকে। এই বায়ু গ্রহণ করলে ফুসফুস, মস্তিষ্ক ও রক্তের কার্যক্ষমতা বাড়ে এবং জীবনীশক্তি (Prana) বৃদ্ধি পায়।
  • হরমোন ভারসাম্য: ব্রাহ্মমুহূর্তে জাগলে মস্তিষ্কের ‘পাইনিয়াল গ্ল্যান্ড’ থেকে মেলাটোনিন ও সেরোটোনিনের নিঃসরণ সঠিকভাবে হয়, যা মানসিক অবসাদ দূর করে সারাদিন শরীরকে প্রাণবন্ত রাখে।

ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে উঠে স্নান না করে জপ-ধ্যান করা যায় কি?

হ্যাঁ, বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে বা নিয়ম মেনে স্নান না করেও ব্রাহ্মমুহূর্তে জপ-ধ্যান করা যায়।

সনাতন শাস্ত্র ও যোগসাধনার বিধান অনুযায়ী, সাধনায় শুচিতা (পবিত্রতা) অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হলেও “বাহ্যিক স্নান” সর্বদা বাধ্যতামূলক নয়—বিশেষ করে শারীরিক অসুস্থতা, অতিরিক্ত শীত বা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে।

শাস্ত্রে শরীর ও মনকে পবিত্র করার জন্য প্রধানত ৭টি উপায়ের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে দৈহিক স্নান না করতে পারলে নিচের বিকল্প শুচিতা বা “মানস স্নান” করে জপে বসা যায়:

১. স্নান ছাড়া জপে বসার সঠিক নিয়ম (বিকল্প পদ্ধতি)

যদি কোনো কারণে ব্রাহ্মমুহূর্তে জল দিয়ে স্নান করা সম্ভব না হয়, তবে নিচের ধাপগুলো মেনে চলা উচিত:

  1. হাত-পা ও মুখ প্রক্ষালণ (আচমন): হাত, পা, মুখ ভালোভাবে ঠান্ডা বা হালকা গরম জল দিয়ে ধুয়ে নিন এবং জল দিয়ে চোখ-মুখ ভালো করে মুছে নিন যাতে তন্দ্রা বা ঘুম কেটে যায়।
  2. শুচি বস্ত্র পরিধান: রাতে ঘুমানোর জামাকাপড় বদলে সম্পূর্ণ পরিষ্কার ও শুচি বস্ত্র পরিধান করুন।
  3. আচমন ও মন্ত্র দ্বারা মার্জন: সামান্য জল ডান হাতের তালুতে নিয়ে ইষ্টনাম স্মরণ করে তিনবার পান (আচমন) করুন এবং মাথায় ও শরীরে সামান্য জল ছিটিয়ে নিন (যাকে ‘মার্জন’ বা ‘প্রোক্ষণ’ বলা হয়)।
  4. মানস স্নান (মানসিক পবিত্রতা): মনে মনে ভাবুন বা কল্পনা করুন যে গঙ্গা বা কোনো পবিত্র নদীর জল আপনার মাথায় পতিত হচ্ছে এবং আপনার শরীর ও মন সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে গেছে।

২. শাস্ত্র অনুযায়ী বিভিন্ন প্রকার স্নান

শাস্ত্র অনুযায়ী জল দিয়ে স্নানকে ‘বারুণ স্নান’ বলা হয়। তবে জল ছাড়াও অন্য বিকল্প স্নানের নির্দেশ রয়েছে:

  • মানস স্নান: পরমাত্মা বা গুরুর ধ্যান করে নিজেকে আত্মিক আলোয় পবিত্র অনুভব করা। এটি সর্বশ্রেষ্ঠ স্নান বলে গণ্য হয়।
  • মৈত্র স্নান: প্রাতঃকালে প্রাতঃকৃত্য সেরে কেবল হাত, পা ও মুখ ধুয়ে পবিত্র জলে আচমন করা।
  • ভৌস্ম স্নান: গায়ে তিলক বা বিভূতি ধারণ করে শুচি হওয়া।

৩. মানসিক জপ ও অজপা জপের ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়

  • বাচিক বা বৈদিক জপ: কোনো বিশেষ কাম্য পূজা বা বৈদিক মন্ত্রপাঠের ক্ষেত্রে শারীরিক স্নানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়।
  • মানসিক জপ ও অজপা জপ: কিন্তু শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার নামস্মরণ, গুরুমন্ত্র, মানসিক জপ বা অজপা জপের জন্য কোনো শারীরিক বা বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা নেই। আপনি যেকোনো অবস্থায়, শয্যায় বসে বা স্নান না করেও মনে মনে বা শ্বাসের সাথে প্রাতঃস্মরণ ও নাম জপ করতে পারেন।

সারসংক্ষেপ: ব্রাহ্মমুহূর্তের মূল উদ্দেশ্য হলো মন যখন শান্ত থাকে, তখন পরমাত্মার সাথে যুক্ত হওয়া। স্নান করতে গিয়ে সময় নষ্ট হওয়া বা ঠাণ্ডা লাগার ভয় থাকলে হাত-মুখ ধুয়ে, কাপড় বদলে জপে বসে যাওয়া অনেক বেশি শ্রেয়, কারণ ব্রাহ্মমুহূর্তের সময়কাল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত ও মূল্যবান।


জপের সময় কুশ বা পশমের আসন ব্যবহার করার ধর্মীয় ও বৈজ্ঞানিক কারণ কী?

জপ ও ধ্যানের সময় সরাসরি খালি মাটিতে না বসে কুশ (কুশাসন) বা পশমের (কম্বল) আসন ব্যবহার করার পেছনে যেমন গভীর আধ্যাত্মিক ও শাস্ত্রীয় তাৎপর্য রয়েছে, তেমনই এর পেছনে রয়েছে স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক কারণ।

১. বৈজ্ঞানিক কারণ (Energy Thermal & Electrical Insulation)

  • তড়িৎ অপরিবাহীতা (Bio-Energy Retention): মানুষের শরীর একটি সুপরিবাহী (Conductor)। জপ ও ধ্যানের সময় জপকর্তার শরীরে যে সূক্ষ্ম আধ্যাত্মিক ও স্নায়বিক শক্তি (Bio-electricity বা spiritual energy) উৎপন্ন হয়, খালি মাটিতে বসলে তা ভূ-সংযোগ (Earth / Grounding)-এর কারণে মাটিতে বিচ্ছুরিত বা বিলীন হয়ে যায়। কুশ এবং পশম (পশমী কম্বল) হলো প্রাকৃতিক তড়িৎ ও তাপ অপরিবাহী (Insulator)। এই আসনগুলো তৈরি শক্তিকে শরীরের ভেতরেই ধরে রাখে।
  • শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: পশম ও কুশ মাটির আর্দ্রতা এবং অতিরিক্ত ঠান্ডা বা গরমকে শরীরে প্রবেশ করতে দেয় না। এতে শরীরের তাপমাত্রা স্থির থাকে, যা স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত রাখতে এবং জপে দীর্ঘক্ষণ একাগ্রতা বজায় রাখতে সাহায্য করে।
  • মেৰুদণ্ড ও আকুপ্রেসার সাপোর্ট: কুশের প্রাকৃতিক গঠন সামান্য খসখসে ও শক্ত হওয়ায় তা সোজা হয়ে বসতে সাহায্য করে এবং ব্যাকপেইন বা অলসতা আসতে দেয় না।

২. ধর্মীয় ও শাস্ত্রীয় কারণ

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা (৬.১১) সহ বিভিন্ন সংহিতা ও যোগশাস্ত্রে আসনের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:

“শুচৌ দেশে প্রতিষ্ঠাপ্য স্থিরমাসনমাত্মনঃ। নাচ্ছ্রিতং নাতিনীচং চেল্লাজিনকুশোত্তরম্॥” অর্থাৎ: পবিত্র স্থানে না-অতি-উচ্চ, না-অতি-নীচ—এমন স্থির আসনে কুশ, মৃগচর্ম এবং বস্ত্র একের ওপর অন্যটি পেতে বসবে।

  • কুশাসনের পবিত্রতা: শাস্ত্র অনুযায়ী কুশ ঘাস পরম পবিত্র এবং সাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন। এটি আশপাশের পরিবেশের ঋণাত্মক তরঙ্গ (Negative energy) শুষে নিয়ে একটি পবিত্র বলয় তৈরি করে।
  • পশমের আসনে সিদ্ধি: পশম বা কম্বলের আসনকে ‘জ্ঞান ও জপ সিদ্ধি’-র প্রতীক ধরা হয়। কাম্য বা নিত্য জপে পশমি আসন মনকে চঞ্চল হতে দেয় না।
  • ভূমিদেবীকে শ্রদ্ধা: সরাসরি মাটিতে বসে পা বা শরীর দিয়ে আঘাত না করে আসন পেতে বসা ভূমির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশের একটি অঙ্গ।

৩. জপে আসন ব্যবহারের কিছু নিয়ম

  1. ব্যক্তিগত আসন: নিজের ব্যবহৃত জপের আসন অন্য কাউকে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত নয় এবং নিজেও অন্যের আসনে জপে বসা এড়িয়ে চলা উচিত (কারণ প্রতিটি সাধকের আসনের সাথে তাঁর নিজস্ব এনার্জি বা স্পন্দন যুক্ত থাকে)।
  2. আসন প্রণাম: জপে বসার আগে এবং জপ শেষে ওঠার সময় আসনে সামান্য জল ছিটিয়ে আসনকে প্রণাম করে উঠতে হয়।

জপ শেষে আসনে জল ছিটিয়ে প্রণাম করার সঠিক নিয়ম ও মন্ত্র কী?

জপ সম্পন্ন করার পর আসনে জল ছিটিয়ে প্রণাম করার প্রক্রিয়াটিকে শাস্ত্র মতে “আসন বিসর্জন” বা “আসন প্রণাম” বলা হয়। জপকালে উৎপন্ন আধ্যাত্মিক শক্তি যাতে ইন্দ্রাধিপতি দেবগণ বা অন্য কোনো শক্তি গ্রহণ না করে, বরং সাধক স্বয়ং সেই তেজ প্রাপ্ত হন—তার জন্যই এই নিয়ম পালন করা হয়।

১. জল ছেটানো ও প্রণামের সঠিক নিয়ম

  1. জপ সমাপ্তি: নির্দিষ্ট সংখ্যক জপ সম্পন্ন হলে জপমালা বা হাত কপালে ঠেকিয়ে ইষ্টদেবতা বা শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবাকে স্মরণ করে জপ সমর্পণ করুন।
  2. আসনের নিচে জল প্রদান: আচমন পাত্র থেকে বা ডান হাতের অনাামিকা আঙুল (Ring Finger) জল স্পর্শ করে আপনার আসনের এক কোণে (অথবা আসনের নিচে মাটিতে) সামান্য জল ছিটিয়ে দিন।
  3. তিলক ধারণ (অঙ্গ স্পর্শ): এরপর সেই আর্দ্র স্থানে ডান হাতের অনামিকা আঙুল স্পর্শ করে নিজের কপালে (তিলক হিসেবে) অথবা বুকের মাঝে (অনাহত চক্রে) স্পর্শ করুন।
  4. আসন স্পর্শ ও প্রণাম: জল ছেটানোর স্থানটি ডান হাতে স্পর্শ করে আসনকে ভূমিপ্রণাম বা মস্তক অবনত করে প্রণাম জানান।
  5. আসন গুটানো: প্রণাম শেষে আসনটি ভাঁজ করে সযত্নে পবিত্র স্থানে তুলে রাখুন।

২. আসন বিসর্জন ও প্রণামের শাস্ত্রীয় মন্ত্র

আসনের নিচে জল দেওয়ার সময় এবং কপালে ফোঁটা নেওয়ার সময় শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী নিচের মন্ত্র পাঠ করা হয়:

ক) সাধারণ মন্ত্র (সংক্ষিপ্ত ও বহুল প্রচলিত):

“ওঁ ইন্দ্রায় নমঃ।” (আসনের নিচে জল ছিটিয়ে দেওয়ার সময়)

অথবা,

“ওঁ আধারশক্তয়ে নমঃ।” (আসন ও ভূমিকে প্রণাম করার সময়)

খ) বিশেষ বিসর্জন স্তোত্র / মন্ত্র:

“পাপোহং পাপকর্মাহং পাপাত্মা পাপসম্ভবঃ। ত্রাহি মাং পুণ্ডরীকাক্ষ সর্বপাপহরো হরিঃ॥ শতক্রতবে নমঃ দেবরাজায় নমঃ। ওঁ মালোবাবায়ং নমঃ”

(অর্থ: হে দেবরাজ ইন্দ্র, আমার সাধনার ফল রক্ষা করুন এবং পরমেশ্বর আমার সকল ভুলত্রুটি ক্ষমা করে জপের তেজ আমার চেতনায় ধারণ করার শক্তি দিন।)

গ) সহজ ভক্তিভাবের পদ্ধতি:

যদি সংষ্কৃত মন্ত্র মনে না থাকে বা উচ্চারণ করতে অসুবিধা হয়, তবে মালোবাবার মূল মন্ত্র “ওঁ মালোবাবায়ং নমঃ” স্মরণ করে মনে মনে বলতে পারেন:

“হে পরমাত্মা, আমার আজকের এই জপের পুণ্য ও তেজ আমার অন্তরে স্থান পাক এবং গুরু কৃপায় এই সাধনা সিদ্ধ হোক।”

৩. এই নিয়মের আধ্যাত্মিক কারণ

তন্ত্র ও পুরাণশাস্ত্রে (বিশেষ করে দেবীভাগবত ও যোগশাস্ত্রে) বলা হয়েছে—যদি জপ শেষে আসনের নিচে জল না দিয়ে সাধক হঠাৎ আসন ছেড়ে উঠে পড়েন, তবে সেই জপের সম্পূর্ণ তেজ ও ফল ইন্দ্রদেব গ্রহণ করেন। আসনে জল ছিটিয়ে সেই জল কপালে স্পর্শ করলে সাধনার তেজ সাধকের নিজের সূক্ষ্ম শরীরে (Aura) স্থায়ীভাবে সঞ্চিত হয়ে থাকে।


জপ শেষ করে ইষ্টদেবতার চরণে জপের ফল সমর্পণ করার সঠিক নিয়ম ও মন্ত্র কী?

জপ সম্পন্ন করার পর তার অহংকার বর্জন করা এবং সম্পূর্ণ সাধনা ও তার ফল ইষ্টদেবতা বা শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার চরণে সঁপে দেওয়া সাধকের জন্য একটি অত্যন্ত জরুরি অঙ্গ। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, জপের ফল ঈশ্বরকে সমর্পণ না করলে সাধকের মনে সূক্ষ্ম অহংকার জন্ম নিতে পারে, যা আধ্যাত্মিক উন্নতির পথ রুদ্ধ করে।

জপ সমর্পণ করার সঠিক নিয়ম ও মন্ত্র নিচে বিশদে দেওয়া হলো:

১. জপ সমর্পণের সঠিক নিয়ম ও পদ্ধতি

  1. জপমালার শেষ স্পর্শ: নির্ধারিত সংখ্যা জপ শেষ হলে জপমালা স্পর্শ করে মাথায় ও কপালে ঠেকান।
  2. ডান হাতের কোশ তৈরি: ডান হাত দিয়ে ‘গোকর্ণ’ বা কোশের মতো ভঙ্গি করুন (অর্থাৎ ডান হাতের তালু কিছুটা নিচু করে সামান্য জল ধারণের মতো গঠন তৈরি করুন)।
  3. জল প্রদান: সেই কোশে সামান্য জল (অল্প কয়েক ফোঁটা জল বা আচমন পাত্র থেকে জল) গ্রহণ করুন।
  4. মনঃসংযোগ ও মন্ত্র পাঠ: মনে মনে পরম পুরুষ শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবা বা ইষ্টদেবের চরণে ধ্যান নিবদ্ধ করে জলসহ জপ সমর্পণের মন্ত্র পাঠ করুন।
  5. জপ সমর্পণ (জল ত্যাগ): মন্ত্র পাঠ বা ভাব ব্যক্ত করার পর হাতের সেই জলটুকু ইষ্টের চরণে (অথবা কোনো তামার পাত্রে / ভূমিতে) অর্পণ করুন।
  6. আসন প্রণাম: জপ অর্পণ শেষে আসনে জল ছিটিয়ে পূর্বে নির্দেশিত নিয়মে কপালে স্পর্শ করে আসন প্রণাম করুন।

২. জপ সমর্পণের প্রধান মন্ত্রসমূহ

ক) সাধারণ ও বৈদিক জপ সমর্পণ মন্ত্র (বহুল প্রচলিত):

“গুহ্যাতিগুহ্যগোপ্তা ত্বং গৃহাণাস্মৎকৃতং জপম্। সিদ্ধির্ভবতু মে দেব ত্বৎপ্রসাদান্ময়ি স্থিরা॥”

  • অর্থ: “হে দেব, তুমি সর্বগুহ্য ও পরম গোপনীয় তত্ত্বের রক্ষক। আমার কৃত এই জপ সমর্পণ গ্রহণ করো। তোমার অশেষ কৃপায় এই সাধনা যেন আমার চেতনায় চিরস্থির ও সিদ্ধিপ্রদ হয়।”

খ) আত্মসমর্পণ ও ফল অর্পণ মন্ত্র:

“কায়েন বাচা মনসেন্দ্রিয়ৈর্বা বুধ্যাত্মনা বৃত্যা স্বভাবাৎ। করোমি যদ্যৎ সকলং পরস্মৈ নারায়ণায়েতি সমর্পয়ামি॥”

  • অর্থ: “কায়িক, বাচিক, মানসিক বা ইন্দ্রিয় দিয়ে স্বভাববশত আমি যা কিছু করেছি, তা সবই পরম দেবতার শ্রীচরণে উৎসর্গ করছি।”

গ) শ্রীশ্রীকাল্কি মালো তত্ত্ব বা ইষ্টভাবের সহজ সমর্পণ বাক্য:

যদি সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারণ বা মুখস্থ করতে অসুবিধা হয়, তবে মালোবাবার মূল মন্ত্র জপপূর্বক সহজ সরল ভক্তিভাবে অর্পণ করা যায়:

“ওঁ মালোবাবায়ং নমঃ। হে পরমাত্মা, শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবা, আমার এই কায়িক, বাচিক ও মানসিক নিত্য জপ ও সাধনার সকল ফল আমি সশ্রদ্ধ চিত্তে আপনার শ্রীচরণে অর্পণ করলাম। আমার সাধনা সিদ্ধ হোক এবং আমার হৃদয়ে ভক্তি স্থির থাকুক।”

৩. জপ সমর্পণের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

  • অহংকার নাশন: জপ সমর্পণের প্রধান লক্ষ্য হলো “আমি এত লক্ষ জপ করেছি”—এই রূপ সাধকের অহংকার নাশ করা।
  • পূর্ণ সমর্পণ ভাব (শরনাগতি): এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাধক নিজেকে কেবল একটি মাধ্যম বলে মনে করেন এবং সাধনার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে ঈশ্বর ও গুরুকে মেনে নেন।

জপ করার পর জপমালা কীভাবে রাখতে হয় এবং জপ ঝুলির সঠিক ব্যবহার কী?

জপ সাধনায় ব্যবহৃত জপমালা ও জপ থলি (জপ ঝুলি) কেবল সাধারণ বস্তু নয়, এগুলো পরম পবিত্র ও সাধকের নিজস্ব স্পন্দনে (Energy) পুষ্ট সাধনার অঙ্গ। তাই জপ শেষে মালা এবং ঝুলির যত্ন নেওয়া ও সঠিক নিয়ম মেনে ব্যবহারের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।

১. জপ ঝুলির সঠিক ব্যবহার

  • গোমুখী ভঙ্গি: জপ থলি বা ঝুলিকে ‘গোমুখী’ বলা হয়। জপ করার সময় সম্পূর্ণ হাত ও মালা যেন এই ঝুলির ভেতরে থাকে। বাইরে থেকে যেন মালার গুটিকা (Beads) দেখা না যায়।
  • তর্জনী অঙ্গুলি (Index Finger) স্পর্শ না করা: জপ ঝুলির ছোট ছিদ্র দিয়ে কেবল শাহাদাত আঙুল বা তর্জনীটি বাইরে বের করে রাখতে হয়। কারণ তর্জনী অহংকারের প্রতীক এবং জপের সময় এই আঙুল দিয়ে মালা স্পর্শ বা স্পর্শ করানো নিষেধ।
  • নাভির ওপরে অবস্থান: জপ করার সময় হাত ও জপ ঝুলি যেন বুকের কাছে (হৃদয় চক্র) বা নাভির ওপরে থাকে। ঝুলি কখনোই হাঁটু বা মাটির নিচে ঝুলিয়ে জপ করা উচিত নয়।
  • ভূমিতে না রাখা: জপ ঝুলি কখনো সরাসরি খালি মাটিতে বা অপরিষ্কার স্থানে রাখতে নেই।

২. জপ করার পর জপমালা রাখার সঠিক নিয়ম

১. গুরু ও ইষ্ট স্মরণ: জপ সমর্পণ ও আসন প্রণামের পর জপমালাটি কপালে ও চোখে ঠেকিয়ে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করুন। ২. ঝুলির ভেতরেই সংরক্ষণ: জপ শেষ হওয়া মাত্র মালাটি বের করে উন্মুক্ত স্থানে বা মাটিতে না রেখে সযত্নে জপ ঝুলির ভেতরে গুটিয়ে রেখে দিন। ৩. উচ্চ ও পবিত্র স্থানে রাখা: জপ ঝুলিসহ মালাটি ঠাকুরের সিংহাসন, আলমারির পবিত্র তাক বা জপবেদির মতো উঁচু স্থানে রাখুন। এটি যেন কখনো বিছানা, মেঝে বা অপবিত্র বস্তুর স্পর্শে না আসে। ৪. গোপনীয়তা রক্ষা: আপনার ব্যক্তিগত জপমালা অন্য কাউকে দেখতে দেওয়া বা স্পর্শ করতে দেওয়া উচিত নয়। অন্যের নেতিবাচক বা ভিন্ন শক্তির স্পর্শ থেকে মালাকে মুক্ত রাখতেই ঝুলিতে ঢেকে রাখা হয়। ৫. গলায় বা শরীরে ধারণ না করা: জপের জন্য নির্ধারিত ‘জপমালা’ গলায় পরিধান করা উচিত নয় (ধারণ করার মালা এবং জপ করার মালা আলাদা রাখা ভালো)।

৩. জপমালা ও ঝুলির শুচিতা ও যত্ন

  • পবিত্র রাখা: স্নান না করে বা অপবিত্র অবস্থায় জপ ঝুলিতে হাত দেওয়া নিষেধ।
  • জপ ঝুলির ধৌতকরণ: ঝুলি ময়লা হলে তা জল ও হালকা সাবান দিয়ে ধুয়ে পরিষ্কার করে শুকিয়ে নিয়ে পুনরায় ব্যবহার করা উচিত।
  • মালার পরিচর্যা: তুলসী, রুদ্রাক্ষ বা চন্দনের মালা হলে তা দীর্ঘদিন ভালো রাখতে মাঝে মাঝে সামান্য খাঁটি ঘি বা তিল তেল দিয়ে হালকা মুছে পরিষ্কার করে নেওয়া যায়।

রুদ্রাক্ষ এবং তুলসী মালার জপ করার নিয়ম ও প্রভাবের মূল পার্থক্য কী?

সনাতন সাধনামার্গে রুদ্রাক্ষ এবং তুলসী—উভয় মালাকেই অত্যন্ত পবিত্র ও ফলদায়ী মনে করা হলেও এদের শক্তি, প্রভাব এবং ব্যবহারের বিধিনিয়মে স্পষ্ট কিছু বৈচিত্র্য রয়েছে।

নিচে এদের মূল পার্থক্য, প্রভাব এবং ব্যবহারের নিয়মাবলী বিশদে আলোচনা করা হলো:

১. মূল পার্থক্য ও বৈশিষ্ট্যের তুলনা

বৈশিষ্ট্যরুদ্রাক্ষ মালা (Rudraksha Bead)তুলসী মালা (Tulsi Bead)
উৎপত্তি ও তত্ত্বভগবান শিবের নেত্রজল (অশ্রু) থেকে উৎপন্ন। এটি শৈব ও শাক্ত ভাবধারার প্রতীক।পরম বৈষ্ণবী দেবী তুলসীর কাঠের গুটিকা। এটি বৈষ্ণব ও ভক্তিভাবের প্রতীক।
প্রধান দেবতাদেবাদিদেব মহাদেব, মহাশক্তি ও ভৈরব।ভগবান শ্রীহরি বিষ্ণু, শ্রীকৃষ্ণ, শ্রীরাম ও নারায়ণ।
শক্তি ও স্বভাবউষ্ণ ও তেজীয়ান (Heat Generating): এর শক্তি অত্যন্ত তীব্র ও সংহারক/শোধনকারী।শীতল ও সৌম্য (Cooling Effect): এর স্পন্দন অত্যন্ত শান্ত, মধুর ও প্রেমভাবাপন্ন।

২. আধ্যাত্মিক ও শারীরিক প্রভাবের পার্থক্য

ক) রুদ্রাক্ষ মালার প্রভাব:

  • চেতনার জাগরণ ও কুণ্ডলিনী শক্তি: রুদ্রাক্ষ শরীরের ভেতরের শক্তির কেন্দ্রগুলোকে (চক্র) জাগ্রত করতে এবং নেতিবাচক শক্তি বা ভয় দূর করতে বিশেষ ভূমিকা রাখে।
  • জড়তা ও তন্দ্রা নাশন: জপে বসার পর যাদের ঘুম, অলসতা বা মন চঞ্চল হয়, রুদ্রাক্ষের তেজ তা দূর করে মনকে তীব্র একাগ্রতা দেয়।
  • শারীরিক প্রভাব: এটি রক্তচাপ (Blood Pressure) নিয়ন্ত্রণ করে, হৃদযন্ত্রকে সুস্থ রাখে এবং রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে।

খ) তুলসী মালার প্রভাব:

  • প্রেমভক্তি ও চিত্তশুদ্ধি: তুলসী মালা অন্তরে অহংকার দূর করে নম্রতা, আত্মসমর্পণ ও নির্মল অনুরাগ বা ভক্তি ভাব জাগ্রত করে।
  • মন শান্তকরণ: এটি মস্তিষ্কের ক্লান্তি, মানসিক চাপ (Stress) এবং ক্রোধ প্রশমিত করে মনকে প্রশান্ত রাখে।
  • শারীরিক প্রভাব: এটি শরীরের তাপ সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় এবং শরীরের চারপাশে একটি সুরক্ষা বলয় তৈরি করে।

৩. জপ করার নিয়ম ও বৈচিত্র্য

১. রুদ্রাক্ষ মালার নিয়ম:

  • শৈব (শিব), শাক্ত (কালী, দুর্গা, চণ্ডী), গণপত্য ও ভৈরব মন্ত্র জপের ক্ষেত্রে রুদ্রাক্ষ মালা ব্যবহারের বিধান রয়েছে।
  • রুদ্রাক্ষ ধারণ বা জপের জন্য শরীরে সাত্ত্বিক ভাব থাকা ভালো, তবে এর শক্তি অত্যন্ত তীব্র হওয়ায় এটি প্রতিকূল অবস্থায়ও সাধককে রক্ষা করে।

২. তুলসী মালার নিয়ম:

  • বৈষ্ণব মন্ত্র (শ্রীকৃষ্ণ, বিষ্ণু, রাম), গায়ত্রী মন্ত্র এবং কোমল ভক্তিধর্মীয় নাম-সংকীর্তনের জন্য তুলসী মালা সর্বশ্রেষ্ঠ।
  • তুলসী মালার ক্ষেত্রে আহার-বিহারে আত্যন্তিক শুদ্ধতা ও সাত্ত্বিকতা পালন করা আবশ্যক। তুলসী মালা হাতে নিয়ে আমিষ বা বাসি খাবার গ্রহণ বা অপবিত্র অবস্থায় স্পর্শ করা নিষেধ।

৪. শ্রীশ্রীকাল্কি মালোতত্ত্বে মালার গুরুত্ব

গুরুর নির্দেশিত যে কোনো সগুণ বা নির্গুণ নামজপে রূপান্তর ও শুদ্ধির জন্য রুদ্রাক্ষ এবং ভক্তি ও স্থিতির জন্য তুলসী—উভয় মালাই গ্রহণযোগ্য। তবে আপনার দীক্ষাগুরুর নির্দেশিত নির্দিষ্ট মালার ব্যবহারই সাধকের জন্য সর্বদা কল্যাণকর।



জপ করার সময় মালার সুমেরু না ডিঙিয়ে কীভাবে উল্টে জপ করতে হয়?

জপমালায় ১০০৮ বা ১০৮টি গুটিকার (দানা) সংযোগস্থলে যে একটি অপেক্ষাকৃত বড় গুটিকা এবং অতিরিক্ত সুতো বা গুরুগ্রন্থি থাকে, তাকে ‘সুমেরু’ (বা গুরুদানা) বলা হয়।

শাস্ত্র অনুযায়ী সুমেরুকে অতিক্রম বা ‘ডিঙিয়ে’ যাওয়া নিষেধ, কারণ সুমেরু পরমাত্মা ও গুরুর চেতনার প্রতীক। এক মালা পূর্ণ হওয়ার পর সুমেরুকে স্পর্শ করে প্রণাম জানিয়ে মালাটিকে উল্টে নিয়ে পরবর্তী মালা শুরু করতে হয়।

মালার সুমেরু না ডিঙিয়ে উল্টে জপ করার সঠিক পদ্ধতি

১. প্রথম মালা সম্পন্ন করা: বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ (বুড়ো আঙুল) এবং মধ্যমা (মাঝের আঙুল) দিয়ে সুমেরুর ঠিক পাশের প্রথম গুটিকা থেকে জপ শুরু করুন। প্রতিটি জপে একটি করে গুটিকা নিজের দিকে টেনে শেষ গুটিকা পর্যন্ত পৌঁছান।

২. সুমেরুতে পৌঁছানো: যখন আপনি জপ করতে করতে ঘুরিয়ে আবার সুমেরুর কাছে এসে পৌঁছাবেন, তখন আপনার এক মালা (১০৮ বা ১০০৮ জপ) পূর্ণ হলো।

৩. সুমেরু প্রণাম: সুমেরু আসার পর সেটিকে ডিঙিয়ে এগোবেন না। জপ ঝুলি বা হাতের মধ্যেই মালাটির সুমেরুকে কপালে ও চোখে ঠেকিয়ে মনে মনে পরমাত্মা বা ইষ্টকে প্রণাম জানান।

৪. অঙ্গুলি দিয়ে মালা ঘোরানোর (Direction Reverse) কৌশল:

  • যে গুটিকাটিতে আপনি শেষ জপটি করেছেন (অর্থাৎ সুমেরুর ঠিক পাশের গুটিকাটি), সেই গুটিকাই হবে আপনার পরবর্তী মালার প্রথম গুটিকা।
  • হাত থেকে মালাটি না নামিয়ে বুড়ো আঙুল ও মাঝের আঙুলের সাহায্যে মালাটিকে ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে বা পজিশন বদলে নিন, যাতে শেষ গুটিকাটি আবার আপনার আঙুলের ওপর আসে।
  • এরপর সুমেরু না ডিঙিয়ে, যেদিক থেকে জপ করে এসেছিলেন, ঠিক তার বিপরীত দিকে (ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে) আবার গুটিকাগুলো একের পর এক টেনে জপ করতে করতে এগিয়ে যান।

সুমেরু না ডিঙানোর আধ্যাত্মিক ও সূক্ষ্ম কারণ

  • শক্তির আবর্তন ও মেরু স্থিরতা: জপ করার সময় মালায় সাধকের সূক্ষ্ম শক্তি সঞ্চিত হতে থাকে। সুমেরু হলো সেই সংগৃহীত শক্তির কেন্দ্রবিন্দু। সুমেরুকে না ডিঙিয়ে উল্টে জপ করলে সঞ্চিত শক্তি বিচ্ছুরিত না হয়ে সাধকের নিজের সূক্ষ্ম শরীরে পুনঃপ্রবাহিত হয়।
  • বিনয় ও গুরুমর্যাদা: সুমেরু হলো জ্ঞান ও গুরুতত্ত্বের প্রতীক। জ্ঞানকে অতিক্রম বা অবজ্ঞা না করে আবার সেখান থেকে বিনয়ের সাথে সাধনা শুরু করার প্রতীক হলো এই উল্টে জপ করার নিয়ম।

জপমালা ছাড়া কেবল আঙুলের কর গুণে জপ করার সঠিক নিয়ম কী?

জপমালা কাছে না থাকলে বা যাতায়াত ও কাজের মধ্যে জপ করার সময় হাত বা আঙুলের গিরি (কর) গুনে জপ করার বিধান শাস্ত্রে রয়েছে। একে ‘করমালা’ বা ‘করজপ’ বলা হয়।

অনুপাত ও গণনার সঠিক শাস্ত্রীয় পদ্ধতি নিচে তুলে ধরা হলো:

১. করজপের সাধারণ নিয়ম ও নিষেধ

  • কোন হাত ব্যবহার করবেন: জপ গণনার জন্য সর্বদা ডান হাত ব্যবহার করতে হবে।
  • যে আঙুলগুলো ব্যবহার্য: তর্জনী (Index finger) বাদে কেবল অনামিকা, কনিষ্ঠা, মধ্যমা এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ (বুড়ো আঙুল) দিয়ে কর গণনা করা হয়।
  • তর্জনী ও নখের ব্যবহার নিষেধ: বুড়ো আঙুলের ডগা দিয়ে অন্যান্য আঙুলের পর্ব বা কর স্পর্শ করতে হয়। নখ দিয়ে স্পর্শ করা বা গণনা করা নিষিদ্ধ।

২. দশ (১০) জপের এক চক্র গণনার সঠিক ক্রম (ঘড়ির কাঁটার দিকে)

ডান হাতের আঙুলের পর্ব (গিরা) নির্দিষ্ট একটি চক্রাকারে গণনা করে মোট ১০ বার জপ করা হয়:

  1. ১ম জপ: অনামিকা আঙুলের (Ring Finger) মূল পর্ব (তলার কর)।
  2. ২য় জপ: অনামিকা আঙুলের মধ্য পর্ব (মাঝের কর)।
  3. ৩য় জপ: অনামিকা আঙুলের অগ্র পর্ব (আঙুলের ডগার তলার কর)।
  4. ৪র্থ জপ: মধ্যমা আঙুলের (Middle Finger) অগ্র পর্ব।
  5. ৫ম জপ: তর্জনী আঙুলের (Index Finger) অগ্র পর্ব।
  6. ৬ষ্ঠ জপ: তর্জনী আঙুলের মধ্য পর্ব।
  7. ৭ম জপ: তর্জনী আঙুলের মূল পর্ব।
  8. ৮ম জপ: কনিষ্ঠা আঙুলের (Little Finger) মূল পর্ব।
  9. ৯ম জপ: কনিষ্ঠা আঙুলের মধ্য পর্ব।
  10. ১০ম জপ: কনিষ্ঠা আঙুলের অগ্র পর্ব।

(অর্থাৎ অনামিকার মূল থেকে শুরু করে বৃত্তাকারে ঘুরে কনিষ্ঠার ডগায় এসে ১০ জপ পূর্ণ হয়।)

৩. ১০৮ সংখ্যা গণনা করার কৌশল

করমালায় এক চক্রে ১০ বার জপ হয়। ১০০ বা ১০৮ সংখ্যা মেলানোর জন্য বাম হাত বা একটি সহজ গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করা যায়:

  • বাম হাতের আঙুল ব্যবহার: ডান হাতে ১ থেকে ১০ গণনা করার পর বাম হাতের কনিষ্ঠা আঙুলের একটি কর ধরে রাখুন (১০০ এর জন্য ১০টি দশ)। এভাবে বাম হাতের অনামিকা, মধ্যমা ও তর্জনীর পর্ব ব্যবহার করে ১০টি দশ (অর্থাৎ ১০ × ১০ = ১০০ জপ) পূর্ণ করুন।
  • বাকি ৮টি জপ: ১০০ জপ পূর্ণ হওয়ার পর ডান হাতের অনামিকার মূল পর্ব থেকে আবার গণনা শুরু করে ৮ম জপ (কনিষ্ঠার মূল পর্ব) পর্যন্ত গেলে মোট ১০৮ জপ পূর্ণ হয়।

৪. করজপের সুবিধা

করজপ সম্পূর্ণ রূপে ‘মানসিক’ বা ‘উপাংশু’ জপের সুযোগ এনে দেয়। এটি যাতায়াত, অফিস বা কাজের ফাঁকে অলক্ষিত অবস্থায় নিরবচ্ছিন্নভাবে সাধনা ও নাম-স্মরণ বজায় রাখতে অত্যন্ত কার্যকর।


মানসিক জপ এবং বাচিক জপের মধ্যে পার্থক্য ও কোনটি বেশি ফলদায়ক?

সাধনমার্গে জপ প্রধানত তিন প্রকার—বাচিক (উচ্চৈঃস্বরে), উপাংশু (ফুসফুস বা ঠোঁট নেড়ে মৃদুস্বরে) এবং মানসিক (মনে মনে)। এদের মধ্যে বাচিক ও মানসিক জপের রূপ, প্রক্রিয়া ও ফলদায়কতার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে।

১. বাচিক জপ ও মানসিক জপের মূল পার্থক্য

বৈশিষ্ট্যবাচিক জপ (Vachika Japa)মানসিক জপ (Manasika Japa)
পদ্ধতিস্পষ্ট ও উচ্চস্বরে উচ্চারণ করে জপ করা হয়, যা অন্য মানুষও শুনতে পায়।কোনো শব্দ না করে, মুখ বা জিহ্বা না নেড়ে সম্পূর্ণ মনে মনে জপ করা হয়।
প্রয়োজনীয়তামন যখন চঞ্চল থাকে, তখন মনকে শব্দে আবদ্ধ করতে এই জপ সাহায্য করে।মন যখন শান্ত ও একাগ্র হয়, তখন পরমাত্মার সাথে একাত্ম হতে এই জপ করা হয়।
শুচিতা ও নিয়মদেশ, কাল, স্থান ও কায়িক শুচিতার (স্নান, আসন ইত্যাদি) প্রয়োজন থাকে।কোনো নির্দিষ্ট স্থান, কাল বা কায়িক শুচিতার নিয়ম নেই; যেকোনো অবস্থায় করা যায়।
মনঃসংযোগে ভূমিকাএটি মনকে প্রাথমিক স্থিরতা দান করার প্রথম ধাপ।এটি সরাসরি চিত্তবৃত্তি নিরোধ করে ধ্যানের গভীর স্তরে নিয়ে যায়।

২. ফলদায়কতার শাস্ত্রীয় তুলনা

শাস্ত্র ও যোগ সংহিতায় এই তিন প্রকার জপের ফলদায়কতার একটি নির্দিষ্ট অনুপাত দেওয়া হয়েছে:\text{বাচিক জপ (১ গুণ)} < \text{উপাংশু জপ (১০০ গুণ)} < \text{মানসিক জপ (১,০০০,০০০ গুণ)}

  • বাচিক জপের ফল: সাধারণ বাচিক জপ সাধককে প্রাথমিক পুণ্য ও উচ্চারণ শুদ্ধি প্রদান করে।
  • মানসিক জপের ফল: মানসিক জপ বাচিক জপের তুলনায় লক্ষ গুণ বা অনন্ত গুণ বেশি ফলদায়ক।

৩. কেন মানসিক জপ বেশি ফলদায়ক?

১. মন ও সূক্ষ্ম শরীরের ওপর প্রভাব: বাচিক জপ কেবল বাক্‌-ইন্দ্রিয় ও স্থূল শরীরে প্রভাব ফেলে, কিন্তু মানসিক জপ সরাসরি ‘মন’ ও ‘সূক্ষ্ম শরীরে’ স্পন্দন তৈরি করে। ২. অবিচ্ছিন্নতা (অজপা জপের দিকে গমন): মানসিক জপ অভ্যাস করতে করতে তা শ্বাসের সাথে যুক্ত হয়ে যায় এবং একসময় তা ‘অজপা জপে’ রূপান্তরিত হয়—যেখানে না চাইলেও ভেতরে ভেতরে ইষ্টনাম চলতে থাকে। ৩. অহংকার নাশন: মুখে জপ করলে লোকদেখানো ভাব বা অহংকার আসার সম্ভাবনা থাকে, কিন্তু মানসিক জপ সম্পূর্ণ গুপ্ত ও নীরব থাকায় তা নিষ্কাম ভক্তি বৃদ্ধি করে।

৪. সাধকদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ

যদিও মানসিক জপ সর্বশ্রেষ্ঠ, তবুও প্রাথমিক সাধকদের জন্য সরাসরি মানসিক জপে দীর্ঘক্ষণ মন ধরে রাখা কঠিন হতে পারে (কারণ মন চঞ্চল হয়ে নানা চিন্তায় ভেসে যায়)।

অতএব, সাধনার সঠিক ক্রম হলো:

  • শুরুতে (মন চঞ্চল থাকলে): কয়েক মিনিট বাচিক বা উপাংশু জপ করে মনকে শব্দের তালে স্থির করে নেওয়া।
  • মন শান্ত হলে: ধীরে ধীরে শব্দ বন্ধ করে মানসিক জপে প্রবেশ করা।

মানসিক জপ থেকে কীভাবে অজপা জপের স্তরে পৌঁছানো যায়?

মানসিক জপ করতে করতে সাধক যখন জপের প্রক্রিয়াটি সচেতন প্রয়াস ছাড়াই অবিরামভাবে হৃদয়ে ও শ্বাসে প্রবাহিত করতে পারেন, সেই অবস্থাকেই বলা হয় অজপা জপ। এটি কোনো জোরপূর্বক করা জপ নয়, বরং সাধনার একটি স্বাভাবিক বা স্বতঃস্ফূর্ত পরিণতি।

মানসিক জপ থেকে ‘অজপা জপ’-এর দিব্য স্তরে পৌঁছানোর প্রধান ধাপ ও কৌশলগুলো নিচে আলোচনা করা হলো:

১. শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে নাম সংযোজন (সোঽহং / হংস বা ইষ্টমন্ত্র)

অজপা জপে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ ও কার্যকারী উপায় হলো মনকে শ্বাসের গতির সাথে যুক্ত করা:

  • শ্বাস গ্রহণের সময় (Inhalation): নাক দিয়ে বাতাস ভেতরে নেওয়ার সময় মনে মনে ইষ্টনামের প্রথম অংশ চিন্তা করুন (যেমন: শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার মূলমন্ত্রের ‘ওঁ মালো’ অংশ)।
  • শ্বাস ত্যাগের সময় (Exhalation): বাতাস বাইরে বের করে দেওয়ার সময় নামের অবশিষ্টাংশ স্মরণ করুন (যেমন: ‘বাবায়ং নমঃ’ অংশ)।
  • এটি নিয়মিত অনুশীলনের ফলে শ্বাসপ্রশ্বাসের প্রতিটি গতির সাথেই মন্ত্রটির উচ্চারণ স্বতঃস্ফূর্ত হতে শুরু করে।

২. হৃদস্পন্দনে ও চেতনায় মনোযোগ (অনাহত সাধনা)

  • মানসিক জপ করার সময় চোখের মধ্যবর্তী স্থান (আজ্ঞা চক্র) অথবা বুকের মাঝখানে হৃদয়কমলে (অনাহত চক্র) মনোযোগ নিবদ্ধ করুন।
  • ভাবুন যে কেবল আপনি বা আপনার মস্তিষ্ক জপ করছে না, আপনার হৃদস্পন্দন এবং রক্তের প্রতিটি অনু-পরমাণু ইষ্টনামে স্পন্দিত হচ্ছে।

৩. ‘কর্তাভাব’ বা ‘অহংকার’ ত্যাগ করা

অজপা জপের মূল চাবিকাঠি হলো “আমি জপ করছি”—এই ভাবটি ত্যাগ করা।

  • জপ করার সময় নিজেকে ‘জপকর্তা’ না ভেবে কেবল একজন ‘শ্রোতা’ বা দ্রষ্টা (Observer) হিসেবে অনুভব করুন।
  • মনে করুন নাম আগেই ভেতরে নিরন্তর ধ্বনিত হচ্ছে, আপনি কেবল শান্ত হয়ে সেই নাম-ধ্বনি শুনছেন।

৪. নিয়মিততা ও কালের সীমা অতিক্রম

  • প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে (যেমন: ব্রাহ্মমুহূর্তে বা রাতে ঘুমানোর পূর্বে) নিরবচ্ছিন্ন মানসিক জপের অভ্যাস গড়ে তুলুন।
  • প্রতিদিনের ১ লক্ষ বা নির্দিষ্ট নামজপের কোটা পূরণের পাশাপাশি চলার সময়, কাজের ফাঁকে, এমনকি ঘুমানোর আগের মুহূর্তেও মনে মনে শ্বাসের সাথে নাম চালানোর অভ্যাস বজায় রাখুন।

অজপা স্তরে পৌঁছানোর লক্ষণসমূহ

  1. স্বতঃস্ফূর্ততা: ঘুমানোর সময় বা ঘুম ভাঙার মুহূর্তেও অনুভব করবেন যে ভেতরে ভেতরে জপ চলতেই থাকছে।
  2. চিন্তামুক্ত মন: জপ চলাকালীন জাগতিক চিন্তাসমূহ মনের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না।
  3. অনাবিল আনন্দ: হৃদয়ে এক অপূর্ব শান্তিসুধা এবং আত্মিক আনন্দ (Ananda) অনুভূত হয়।

সারকথা: মানসিক জপ হলো সাধকের ‘প্রয়াস’ (Effort), আর অজপা জপ হলো পরমাত্মা ও গুরুর ‘কৃপা’ (Grace)। নিয়মিত শুদ্ধ সদাচার ও মানসিক জপ করতে করতেই এই কৃপাসিদ্ধ অবস্থা লাভ হয়।


অজপা জপের অনুশীলনের সময় মন চঞ্চল বা বিভ্রান্ত হলে তা কীভাবে সামলাবেন?

অজপা জপের অনুশীলনের সময় মন চঞ্চল, ইতস্তত বিভ্রান্ত বা ভাবনায় ভেসে যাওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া। সাধনার প্রাথমিক ও মধ্যবর্তী স্তরে মন নিজের স্বভাববশত বহিরমুখী হতে চেষ্টা করে। মনকে জোর করে দমন না করে অত্যন্ত কৌশল ও ধৈর্যের সাথে পুনরায় নাম-তরঙ্গে ফিরিয়ে আনাই সাধকের মূল কাজ।

মন চঞ্চল হলে তা সামলানোর কার্যকারী কৌশলগুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. চঞ্চলতার সাথে যুদ্ধ না করে ‘দ্রষ্টা’ (Observer) হওয়া

মন যখন চঞ্চল হয়, তখন “কেন মন চঞ্চল হচ্ছে” বা “আমার ধ্যান নষ্ট হয়ে গেল”—এ নিয়ে ক্ষুব্ধ বা হতাশ হবেন না।

  • মনকে দেখতে শিখুন: নিজেকে চিন্তার সাথে গুলিয়ে না ফেলে কেবল একজন নিষ্পক্ষ দ্রষ্টা বা সাক্ষী হিসেবে মনকে দেখতে থাকুন।
  • মনে মনে ভাবুন—“আমি মন নই, আমি চেতনা; মন যা চিন্তা করছে তা আমার বাইরে ঘটছে।” যখনই আপনি মনের চঞ্চলতাকে নিরপেক্ষভাবে দেখতে শুরু করবেন, মন নিজের তেজ হারিয়ে ফেলে শান্ত হতে বাধ্য হবে।

২. অজপা থেকে সাময়িকভাবে ‘উপাংশু’ বা ‘বাচিক’ জপে ফিরে আসা

মন যদি অতিরিক্ত চঞ্চল বা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে, তবে জোর করে অজপা বা মানসিক জপ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবেন না।

  • ধাপ ১: অজপা বা নীরব জপ থামিয়ে দিন।
  • ধাপ ২: জিভ ও ঠোঁট নেড়ে উপাংশু জপে (মৃদু আওয়াজে যা কেবল আপনি শুনবেন) বা প্রয়োজনে স্পষ্ট বাচিক জপে (উচ্চস্বরে) ফিরে আসুন।
  • ধাপ ৩: নাম উচ্চারণের শব্দের ওপর কান ও মন সম্পূর্ণ নিবদ্ধ করুন। কয়েক মিনিট শব্দে মন আটকে গেলে মন যখন আবার শান্ত ও স্থির হয়ে আসবে, তখন পুনরায় মানসিক জপ ও শ্বাসের সাথে অজপা জপে প্রবেশ করুন।

৩. শ্বাস-প্রশ্বাসকে ধীর ও গভীর করা (প্রাণায়াম)

মনের সাথে প্রাণশক্তির (Respiratory System) সরাসরি সংযোগ রয়েছে। মন চঞ্চল হলে শ্বাসের গতি দ্রুত বা অসংযত হয়ে পড়ে।

  • চঞ্চলতা দেখা দিলে ৩ থেকে ৫ বার ধীর, দীর্ঘ ও গভীর শ্বাস গ্রহণ করুন এবং ধীরগতিতে তা ত্যাগ করুন।
  • শ্বাস নেওয়ার সময় অনুভব করুন ঈশ্বরীয় পরম শান্তি আপনার ভেতরে প্রবেশ করছে, এবং শ্বাস ত্যাগের সময় অনুভব করুন মনের চঞ্চলতা ও মানসিক বিকার বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছে।
  • শ্বাস শান্ত হলে মন স্বতঃস্ফূর্তভাবেই শান্ত হয়ে আসবে।

৪. দৃষ্টি বা মনোযোগকে নির্দিষ্ট চক্রে নিবদ্ধ করা

উড়ন্ত মনকে কোনো আলম্বনে বা নির্দিষ্ট বিন্দুতে আটকে রাখা প্রয়োজন:

  • আজ্ঞা চক্র (ভ্রূযুগলের মাঝখানে): আপনার বন্ধ চোখের দৃষ্টি ও মনোযোগ দুই ভুরুর মধ্যবর্তী স্থানে স্থির করার চেষ্টা করুন।
  • অনাহত চক্র (হৃদয় পদ্মে): অথবা বুক বা হৃদয়ের মাঝে মনোযোগ রেখে ভাবুন—আপনার ইষ্টনাম প্রতিটি স্পন্দনের সাথে সেখান থেকেই উচ্চারিত হচ্ছে।

৫. ইষ্টরূপ বা গুরুর দিব্যরূপ দর্শন (Trataka / Image Visualisation)

কেবল শব্দে মন না টিকলে মনের মধ্যে রূপের আবেশ আনুন। শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবা বা আপনার ইষ্টদেবতার অমল ও করুণাময় দিব্য রূপটিকে চোখ বন্ধ করে হৃদয়ে বা আজ্ঞা চক্রে ভাসিয়ে তোলার চেষ্টা করুন। নাম ও রূপ—এই দুইয়ের সমন্বয়ে মন দ্রুত স্থিরতা লাভ করে।

সাধন বার্তা: মন ১০০ বার চঞ্চল হলে আপনাকে ১০১ বার তাকে বিনম্রভাবে নাম-স্মরণে ফিরিয়ে আনতে হবে। এই বারবার ফিরিয়ে আনার অবিচল চেষ্টাই হলো প্রকৃত জপ-তপস্যা।


জপ ও ধ্যানে বসার পর ঘুম বা তন্দ্রা আসলে তা দূর করার উপায় কী?

জপ ও ধ্যানে বসার পর ঘুম, আলস্য বা তন্দ্রাভাব আসাকে যোগশাস্ত্রে সাধনার প্রধান অন্তরায় বা ‘লয়’ দোষ বলা হয়। মন যখন অতিরিক্ত শান্ত হতে চায় কিন্তু একাগ্রতার অভাবে তা অজ্ঞানতার স্তরে নেমে যায়, তখনই তন্দ্রার সৃষ্টি হয়।

এই তন্দ্রাভাব কাটানো এবং জপে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার জন্য নিচের কায়িক, মানসিক ও পরিবেশগত কৌশলগুলো প্রয়োগ করা যেতে পারে:

১. তাত্ক্ষণিক শারীরিক ও প্রাণায়াম কৌশল

  1. গভীর ও দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস (ভস্ত্রিকা বা কপালভাতি): তন্দ্রা এলেই চোখ খুলে ১০-১৫ বার দ্রুত ও গভীর শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ করুন। এটি মস্তিষ্কে অক্সিজেনের মাত্রা বাড়িয়ে সঙ্গে সঙ্গে তন্দ্রা দূর করে।
  2. আচমন ও শীতল জলের স্পর্শ: আসন থেকে উঠে হাত-মুখ এবং চোখে শীতল জলের ছিটা দিন। ঘাড়ের পেছনের অংশে ও কানের লতিতে ঠান্ডা জল স্পর্শ করালে মস্তিষ্কের স্নায়ু তৎক্ষণাৎ সতেজ হয়ে ওঠে।
  3. শারীরিক অবস্থান পরিবর্তন: বসাবস্থায় ঘুম আসলে কয়েক মিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে বা হেঁটে হেঁটে (চংক্রমণ জপ) মনে মনে জপ করুন। তন্দ্রা কেটে গেলে পুনরায় আসনে বসুন।
  4. মেরুদণ্ড সোজা রাখা: মেরুদণ্ড, ঘাড় ও মাথা বাঁকা হয়ে গেলে তন্দ্রা দ্রুত গ্রাস করে। মেরুদণ্ডকে সম্পূর্ণ সোজা ও সোজা হয়ে বসার ভঙ্গি বজায় রাখুন।

২. জপের পদ্ধতি পরিবর্তন

  • বাচিক বা উপাংশু জপে রূপান্তর: মানসিক জপ বা অজপা অনুশীলনের সময় তন্দ্রা আসলে অবিলম্বে স্পষ্ট কণ্ঠে বাচিক (শব্দ করে) বা অন্তত ঠোঁট নেড়ে উপাংশু জপ শুরু করুন। হাত বা কর স্পর্শ করে জপের সংখ্যা গণনা করলেও মন সক্রিয় থাকে।
  • চোখ খোলা রেখে জপ: সম্পূর্ণ চোখ বন্ধ না রেখে আধবোজা (নাগ্রা দৃষ্টি বা নাকে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে) অথবা সামনে থাকা গুরু বা ইষ্টদেবতার ছবির দিকে তাকিয়ে (ত্রাটক ভাব) জপ করুন।

৩. পূর্বপ্রস্তুতি ও দৈনন্দিন অভ্যাস সংশোধন

  • মিতাহার ও সাত্ত্বিক খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত আহার (বিশেষ করে অতিরিক্ত শর্করা, ভাত বা গুরুপাক খাবার) গ্রহণের পর বা পেট ভরা অবস্থায় জপে বসলে তন্দ্রা আসবেই। সর্বদা পাকস্থলীর এক-তৃতীয়াংশ খালি রেখে হালকা সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম: রাতে অন্তত ৬–৭ ঘণ্টার গভীর ও স্বাভাবিক ঘুম নিশ্চিত করুন। ঘুমের অভাব নিয়ে জোর করে জপে বসলে মন বারবার লয় বা তন্দ্রায় চলে যাবে।
  • আলোকের উপস্থিতি: সম্পূর্ণ অন্ধকার ঘরে জপে না বসে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার আলো ও বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা আছে এমন স্থানে জপে বসুন।

সাধনার দৃষ্টিভঙ্গি: তন্দ্রাভাবকে ক্ষোভের চোখে না দেখে মনকে ধীর স্থির কিন্তু সজাগ রাখা শিখতে হয়। নিদ্রা ও ধ্যানের মধ্যবর্তী এই সূক্ষ্ম রেখা অতিক্রম করাই হলো সাধকের মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ লাভের প্রথম ধাপ।


ব্রাহ্মমুহূর্তে ঘুম থেকে ওঠার সময় অলসতা ও ঘুম কাটিয়ে কীভাবে সহজে সতেজ হওয়া যায়?

ব্রাহ্মমুহূর্তে (সূর্যোদয়ের প্রায় দেড় ঘণ্টা আগে) ঘুম থেকে ওঠার সময় শরীলে জমে থাকা অলসতা, ভারীভাব বা জড়তা কাটিয়ে তৎক্ষণাৎ সতেজ হয়ে ওঠা সাধকদের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা।

ঘুম ভাঙার পর তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব দূর করে শরীর ও মনকে দ্রুত প্রফুল্ল ও সতেজ করার জন্য বৈজ্ঞানিক ও যোগশাস্ত্রী কৌশলগুলো প্রয়োগ করতে পারেন:

১. শয্যাতেই তাৎক্ষণিক সতেজতার উপায়

  1. করদর্শন ও হাত ঘষা (Friction Warmth): চোখ খোলার পরপরই বিছানায় বসে দুই হাতের তালু ১০-১৫ সেকেন্ড শক্ত করে ঘষে ঈষদুষ্ণ করুন এবং সেই উষ্ণ তালু চোখ ও মুখের ওপর আলতো করে স্পর্শ করুন। এটি চোখের স্নায়ু ও মস্তিষ্ককে প্রাতঃকালীন সতর্ক সংকেত পাঠায়।
  2. দীর্ঘ প্রসারণ (Full Body Stretch): বিছানায় শুয়ে বা বসেই দুই হাত মাথার ওপর তুলে হাত-পা প্রসারিত করুন (তড়াসন ভঙ্গি)। এতে সারারাত নিষ্ক্রিয় থাকা মাংসপেশি ও রক্তনালীতে দ্রুত রক্ত সঞ্চালন শুরু হয়।
  3. করদর্শন মন্ত্র ও সংকল্প: দুই হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে ইষ্টদেবতা বা শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবাকে স্মরণ করে দিনটি সাধনাময় করার একটি দৃঢ় সংকল্প গ্রহণ করুন।

২. শয্যা ত্যাগের পর কায়িক সতেজতা

  • এক গ্লাস ঈষদুষ্ণ জল পান (উষাপান): ঘুম থেকে উঠে বাথরুম যাওয়ার আগে বা মুখ ধোওয়ার সময় ১ গ্লাস হালকা গরম জল (বা স্বাভাবিক তাপমাত্রার জল) পান করুন। এটি ভেতরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে জাগিয়ে তোলে এবং পরিপাকতন্ত্রকে সক্রিয় করে প্রাতঃকৃত্য সহজ করে দেয়।
  • চোখ ও কানের মর্দন (Eye Washing & Ear Massage): ঠান্ডা জল দিয়ে চোখে ৫-৭ বার হালকা ঝাপসা দিন। একই সাথে কান ও কানের লতি আঙুল দিয়ে ১০-১৫ সেকেন্ড হালকা মাসাজ করুন—কানে প্রচুর স্নায়ুপ্রান্ত (Nerve endings) থাকে, যা মাসাজ করলে মস্তিষ্কের ক্লান্তি তৎক্ষণাৎ দূর হয়।
  • শুচি স্নান বা মুখ-হাত-পা ধোওয়া: প্রাতঃকৃত্য সেরে সম্ভব হলে স্নান করে নিন। স্নান সম্ভব না হলে ঠান্ডা জলে হাত, পা, মুখ ও ঘাড়ের পেছনের অংশ ভালো করে ধুয়ে নিন।

৩. দ্রুত অ্যালার্টনেস আনার যোগজ কৌশল

  • কপালভাতি বা ভস্ত্রিকা প্রাণায়াম: আসনে বসার আগে দাঁড়িয়ে বা বসে মিনিটখানেক দ্রুত গতিতে শ্বাস ছাড়ার অনুশীলন (কপালভাতি) অথবা ১০-১২ বার গভীর শ্বাস গ্রহণ ও ত্যাগ (ভস্ত্রিকা) করুন। ফুসফুসে অক্সিজেনের মাত্রার এই হঠাৎ বৃদ্ধি রক্তের কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে তন্দ্রাভাবকে পুরোপুরি ধুয়েমুছে দেয়।
  • ৩-৪ মিনিট চংক্রমণ (Walking): শরীর বেশি অলস লাগলে জপের ঘরে বা বারান্দায় ধীর পায়ে ৩-৪ মিনিট হাঁটাহাঁটি করুন এবং খোলা বাতাসের স্পর্শ নিন।

৪. পূর্বরাত্রির কিছু প্রস্তুতি (যা প্রাতঃকালে সাহায্য করে)

  • রাতের হালকা ও সাত্ত্বিক আহার: রাতে অতিরিক্ত গুরুপাক বা তেল-মশলাযুক্ত খাবার খেলে ব্রাহ্মমুহূর্তে ওঠার পর শরীর ভারী লাগে এবং ঘুম কাটে না। সন্ধ্যার আহার যেন হালকা ও সুপাচ্য হয়।
  • ঘুমানোর নির্দ্বিধ সময় নির্ধারণ: রাতে অতিরিক্ত রাত না জেগে নির্দিষ্ট সময়ে (যেমন ১০টার মধ্যে) ঘুমাতে যাওয়া উচিত, যাতে ব্রাহ্মমুহূর্তে স্বাভাবিকভাবেই শারীরিক ৬-৭ ঘণ্টার ঘুম পূর্ণ হয়ে যায়।

ব্রাহ্মমুহূর্তে সাধনায় বসার সময় কোন দিকে মুখ করা এবং কী ধরনের আসন ব্যবহার করা উচিত?

ব্রাহ্মমুহূর্তে সাধনায় বসার সময় দিক নির্ণয় এবং সঠিক আসন নির্বাচন—উভয় বিষয়ই ধ্যানের গভীরে প্রবেশ এবং শুভ শক্তির সঞ্চারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১. দিক নির্দেশ (Orientation for Meditation)

ব্রাহ্মমুহূর্তে বা যেকোনো প্রাতঃকালীন সাধনায় বসার সময় পূর্ব (East) অথবা উত্তর (North) দিকে মুখ করে বসা শাস্ত্রানুসারে সর্বশ্রেষ্ঠ:

  • পূর্ব দিক (East): প্রাতঃকালে সূর্যোদয় পূর্ব দিকে হয়। পূর্ব দিকে মুখ করে বসলে উদীয়মান সূর্যের প্রাণশক্তি, তেজ ও সচেতনতা সাধকের চেতনায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। এটি জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক জাগরণের পথ সুগম করে।
  • উত্তর দিক (North): উত্তর দিক হলো শ্রীকৈলাস, হিমালয় ও সিদ্ধ পুরুষদের দিব্য তরঙ্গের দিক। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গিতে, পৃথিবীর চুম্বকীয় ক্ষেত্র (Magnetic field) উত্তর থেকে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত হয়। উত্তর দিকে মুখ করে বসলে মস্তিষ্কের স্নায়ুতন্ত্র ও শরীরের বায়ুপ্রবাহের সামঞ্জস্য বজায় থাকে, যা মনকে দ্রুত স্থির ও ধ্যা নান্বিত করে।

২. আসনের নির্বাচন ও ব্যবহারবিধি

সাধনার আসনে সরাসরি খালি মাটিতে না বসে শারীরিক ও শক্তির সুরক্ষার জন্য বিশেষ প্রাকৃতির উপাদানের আসন ব্যবহার করা হয়:

ক) কুশ বা পশমের (কম্বল) আসন:

  • কুশাসন (Kusha Mat): কুশ ঘাস সাত্ত্বিক গুণসম্পন্ন এবং প্রাকৃতিক তড়িৎ ও তাপ অপরিবাহী (Insulator)। এটি নেতিবাচক তরঙ্গ শুষে নেয় এবং ভূ-সংযোগের (Grounding) মাধ্যমে সাধকের শরীরের অর্জিত স্পন্দন বা শক্তি মাটিতে বিচ্ছুরিত হতে দেয় না।
  • পশমের আসন (Woolen Mat): পশমী কম্বলের আসন জপ ও ধ্যানের শক্তি ধরে রাখতে অত্যন্ত ফলদায়ক। বিশেষ করে শীতকালে বা ভোরে মেঝের ঠান্ডা ভাব থেকে শরীরকে রক্ষা করতে পশমি আসন চমৎকার কাজ করে।

খ) আসনের সঠিক বিন্যাস (Layering):

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় আসনে বসার একটি সুনির্দিষ্ট ক্রম বা স্তরের কথা বলা হয়েছে—

  1. সবার নিচে কুশের আসন বা একটি সুতি কাপড়।
  2. তার ওপর একটি মোটা পশম/কম্বল বা সুতি কাপড়ের স্তর। (এতে আসনটি যেমন আরামদায়ক হয়, তেমনই তা সর্বতোভাবে শক্তি সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করে।)

৩. বিশেষ কিছু সতর্কতা

  • সরাসরি মাটিতে বসা নিষেধ: সরাসরি মেঝে বা মাটিতে বসে জপ করলে উৎপন্ন তেজ বা শক্তি ভূমিদেবী শোষণ করে নেন, ফলে সাধক ক্লান্ত বোধ করতে পারেন।
  • অন্যের আসন ব্যবহার না করা: সাধনার আসনটি একান্তই নিজের হওয়া উচিত। দীর্ঘ অনুশীলনে আসনে সাধকের নিজস্ব শক্তি-স্পন্দন জমা হয়, যা অন্য কেউ ব্যবহার করলে ব্যাহত হতে পারে।
  • অত্যন্ত উঁচু বা নিচু স্থান এড়ানো: আসন যেন সমতল, পরিষ্কার ও স্থির স্থানে পাতা হয়।

সায়াহ্ন বা রাতে জপ-ধ্যানে বসার সময় কোন দিকে মুখ করা এবং কী কী নিয়ম মানা উচিত?

প্রদোষকাল (সন্ধ্যা) এবং নিশীথকাল (রাত)—উভয় সময়ই আধ্যাত্মিক সাধনার জন্য বিশেষ শক্তিশালী। প্রাতঃকালের মতো সায়াহ্ন ও সান্ধ্য সাধনারও নিজস্ব কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও দিক নির্দেশ রয়েছে।

১. মুখ করার সঠিক দিক (Direction)

  • উত্তর-পশ্চিম (North-West) বা উত্তর (North) দিক: সন্ধ্যার পর এবং রাতে জপ-ধ্যানে বসার সময় উত্তর বা উত্তর-পশ্চিম (বায়ু কোণ) দিকে মুখ করে বসা সবচেয়ে শুভ ও উপযোগী। রাতে উত্তর দিক থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের শান্ত ও ধ্যানস্থ শক্তি সক্রিয় থাকে।
  • পূর্ব দিক (East): সায়াহ্নকালে (সন্ধ্যা ৬:০০ – ৭:৩০) সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে পর্যন্ত পূর্ব দিকে মুখ করে জপ করা যেতে পারে। তবে সূর্যাস্তের পর বা গভীর রাতে পূর্ব দিকের চেয়ে উত্তর দিকই বেশি উপযোগী।
  • পশ্চিম দিক (West): সায়াহ্নকালীন আরতি বা নির্দিষ্ট কিছু শান্তিকামী কাম্য সাধনায় পশ্চিম মুখে বসার বিধান রয়েছে, তবে সাধারণ নামজপে উত্তর মুখ করাই শ্রেয়।
  • দক্ষিণ দিক বর্জনীয়: সাধারণ নামজপ, ইষ্টমন্ত্র বা গায়ত্রী জপে দক্ষিণ দিকে মুখ করে বসা নিষিদ্ধ (কেবলমাত্র বিশেষ তান্ত্রিক বা কৃত্য সাধনা ব্যতিরেকে)।

২. সায়াহ্ন ও রাতের জপের গুরুত্বপূর্ণ নিয়মাবলী

  1. হাত-পা ও মুখ ধৌতকরণ (সন্ধ্যা প্রক্ষালণ): সারাদিনের কাজের পর সন্ধ্যায় জপে বসার আগে হাত, পা, মুখ ঠান্ডা বা স্বাভাবিক জলে ভালো করে ধুয়ে নেওয়া আবশ্যক। সম্ভব হলে সায়াহ্নকালীন জামাকাপড় বদলে পরিষ্কার ও হালকা রঙের শুচি বস্ত্র পরিধান করুন।
  2. আচমন ও সন্ধ্যাবন্দনা/সন্ধ্যা আরতি: আসনে বসার আগে তিনবার আচমন (জল পান) করে শরীর ও মনকে পবিত্র করে নিন। এরপর ঘরের দেবস্থানে ধূপ ও প্রদীপ (ঘি বা তিল তেলের) জ্বালিয়ে পরিবেশকে সাত্ত্বিক করুন।
  3. আহারের সময় নির্ধারণ (মিতাহার): রাতের জপ বা ধ্যানে বসার কমপক্ষে ১ ঘণ্টা আগে রাতের আহার সম্পন্ন করা উচিত, অথবা জপ-ধ্যান শেষ করে রাতে আহার করা সবচেয়ে উত্তম। পেট ভরা থাকলে তন্দ্রা ও তমো গুণ প্রাধান্য পায়।
  4. গায়ত্রী মন্ত্রের সময়সীমা: বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্র জপ করার নিয়ম কেবল সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত (সন্ধ্যা উতরানোর পর বৈদিক গায়ত্রী মন্ত্র স্পষ্ট উচ্চারণ করে জপ করা নিষেধ; তবে ইষ্টনাম, গুরুমন্ত্র বা মানসিক জপ গভীর রাতেও পরম সুফলদায়ী)।
  5. মানসিক জপের প্রাধান্য: রাতের বেলা কোলাহল কমে যাওয়ায় মন সহজে অন্তর্মুখী হয়। তাই রাতে বাচিক (শব্দ করে) জপের চেয়ে উপাংশু বা মানসিক জপ এবং শ্বাসের সাথে অজপা সাধনা অনেক বেশি গভীর ও কার্যকর হয়।

৩. সায়াহ্ন ও নৈশ সাধনার আধ্যাত্মিক গুরুত্ব

দিন ও রাতের মিলনস্থল (সায়াহ্নসন্ধ্যা) এবং গভীর রাত (বিশেষ করে রাত ১১:০০ থেকে ১:০০ ঘটিকার ‘নিশীথ কাল’) হলো প্রকৃতির সুষুম্না নাড়ী সক্রিয় হওয়ার সময়। এই সময়ে মানসিক জপ করলে সামান্য চেষ্টাতেই মন গভীর সমাধিতে প্রবেশ করতে পারে।


জপের সময় মনকে সম্পূর্ণভাবে ইষ্টনামে ধরে রাখার কিছু সহজ উপায় বলুন।

জপের সময় মন চঞ্চল হওয়া বা অন্য চিন্তায় ভেসে যাওয়া সাধনার একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক পর্যায়। মনকে জোর করে দমন না করে কিছু নির্দিষ্ট কৌশল ও অনুশীলনের মাধ্যমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে ইষ্টনামে নিবদ্ধ রাখা সম্ভব।

মনকে সম্পূর্ণভাবে ইষ্টনামে ধরে রাখার কিছু সহজ ও কার্যকর উপায় নিচে দেওয়া হলো:

১. নাম ও রূপের সংযোগ (শব্দ ও রূপ ধ্যান)

কেবল শব্দে মন দীর্ঘক্ষণ স্থির রাখা কঠিন হতে পারে। তাই নাম জপের সাথে সাথে ইষ্টদেবতা বা শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবার দিব্য রূপ মনে মনে ভাসিয়ে তোলার চেষ্টা করুন:

  • চোখের সামনে রূপের আবেশ: বন্ধ চোখের সামনে (ভ্রূযুগলের মাঝে আজ্ঞা চক্রে বা হৃদ পদ্মে) গুরুর বা ইষ্টের করুণাময় রূপ, পদযুগল বা জ্যোতিঃস্বরূপকে কল্পনা করুন।
  • ভাবনা: মনে করুন, আপনি যাঁর নাম জপ করছেন, তিনি প্রত্যক্ষভাবে আপনার সামনেই विराजमान এবং আপনার নামজপ শুনছেন।

২. শ্রবণ মনোযোগ বৃদ্ধি (নিজের জপ নিজে শোনা)

জপ করার সময় মন তখনই ঘুরে বেড়ায় যখন আমরা যান্ত্রিকভাবে জপ করতে থাকি।

  • জপ করার সময় আপনার মুখ থেকে (বা মনের ভেতর) যে নামটি ধ্বনিত হচ্ছে, সেই শব্দটির দিকে কান দিয়ে মনোযোগ সহকারে শুনুন।
  • মন যখন জপের শব্দ বা স্পন্দনের ‘শ্রোতা’ হয়ে যায়, তখন অন্য চিন্তার জন্য মনের দরজা বন্ধ হয়ে যায়।

৩. শ্বাসের সাথে নাম যুক্ত করা (প্রাণায়াম কৌশল)

শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে নামকে মেলালে মন দ্রুত স্থির হয়:

  • পুরক (শ্বাস নেওয়ার সময়) নামের প্রথমাংশ এবং রেচক (শ্বাস ছাড়ার সময়) নামের শেষাংশ মনে মনে উচ্চারণ করুন।
  • শ্বাসের গতি ধীর ও ছন্দময় হলে মনের চঞ্চলতা ও মানসিক বিকার কমে আসে।

৪. পঞ্চেন্দ্রিয়ের বিক্ষেপ রোধ করা

  • স্পর্শে মনোযোগ (মালা ও কর): আঙুলের সাহায্যে জপমালার দানা বা কর স্পর্শ করার অনুভূতির ওপর সচেতন থাকুন। Physical touch পয়েন্ট হিসেবে কাজ করে মনকে ধরে রাখে।
  • চোখের অবস্থান: চোখ সম্পূর্ণ বন্ধ না করে ঈষৎ আধবোজা (নাগ্রা দৃষ্টি বা নাসিকাগ্রে দৃষ্টি) রাখতে পারেন, এতে অলসতা ও কাল্পনিক চিন্তা কমে যায়।

৫. জপের পূর্বে ২-৩ মিনিট প্রস্তুতি (Mental Tuning)

সোজা আসনে বসে তড়িঘড়ি জপ শুরু না করে জপে বসার আগে ২ মিনিট নিজেকে প্রস্তুত করুন:

  • কিছু সময় নীরব হয়ে বসুন, কয়েকটি দীর্ঘ শ্বাস নিন।
  • নিজেকে স্মরণ করিয়ে দিন: “আগামী ৩০ মিনিট বা ১ ঘণ্টার জন্য সংসারের সকল চিন্তা, উদ্বেগ ও কাজকে আমি বাইরে রেখে এলাম। এই সময়টি কেবল আমার এবং আমার পরমাত্মার।”

৬. স্থান ও সময়ের ধারাবাহিকতা

প্রতিদিন একই সময়ে (যেমন: ব্রাহ্মমুহূর্তে বা সন্ধ্যায়) এবং একই আসনে বসে জপ করার অভ্যাস গড়ে তুলুন। নিয়মিত একই স্থানে সাধনা করলে সেই স্থানের বায়ুমণ্ডলে একটি ইতিবাচক স্পন্দন (Vibration) তৈরি হয়, যা জপে বসামাত্র মনকে দ্রুত স্থির করে দেয়।


প্রতিদিন বা নির্দিষ্ট সময়ে ১ লক্ষ জপ সম্পন্ন করার জন্য সঠিক সময় ব্যবস্থাপনা কীভাবে করা উচিত?

প্রতিদিন ১ লক্ষ (১,০০,০০০) নামজপ সম্পন্ন করা একটি অত্যন্ত উচ্চমার্গের এবং সুদৃঢ় সংকল্পের সাধনা। জপের গতি এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে ১ লক্ষ জপ সম্পন্ন করতে সাধারণত ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে।

এত বিশাল সংখ্যা পূর্ণ করার জন্য প্রতিদিনের জীবনধারা, আহার, বিশ্রাম এবং সময়কে সুনির্দিষ্ট কয়েকটি পর্বে ভাগ করে ব্যবস্থাপনা (Time Management) করা আবশ্যক।

১. জপের গতি ও সময় হিসাব (Standard Calculation)

  • উপাংশু বা দ্রুত মানসিক জপের গতি: মধ্যম থেকে দ্রুত গতিতে প্রতি মিনিটে সাধারণত ১২০ থেকে ১৫০ টি নামজপ সম্ভব।
  • ১ মালার সময় (১০৮ জপ): প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০ সেকেন্ড।
  • ১০,০০০ জপের সময়: প্রায় ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট।
  • ১,০০,০০০ জপের মোট সময়: প্রায় ১৩ থেকে ১৫ ঘণ্টা (নিরবচ্ছিন্ন জপ হিসেবে)।

২. ২৪ ঘণ্টাকে ৪টি প্রধান পর্বে বিভাজন (Daily Schedule Protocol)

১ লক্ষ জপ কখনোই একাসনে বা একটানা সম্পন্ন করা উচিত নয়; এতে শরীর ক্লান্ত হয়ে তন্দ্রা ও পিঠ-কোমরে যন্ত্রণার সৃষ্টি হয়। তাই দিনটিকে ৪টি মুখ্য পর্বে ভাগ করে নেওয়া শ্রেয়:

প্রথম পর্ব: প্রাতঃকালীন জপ (ব্রাহ্মমুহূর্ত ও প্রত্যূষ)

  • সময়: ভোর ৩:৩০ – সকাল ৭:৩০ (৪ ঘণ্টা)
  • লক্ষ্যমাত্রা: ৩০,০০০ জপ
  • কৌশল: রাতের বিশ্রামের পর মন সবচেয়ে শান্ত থাকে। এই ৪ ঘণ্টায় কোনো শারীরিক বা মানসিক থান্তি ছাড়া সবচেয়ে দ্রুত ও একাগ্র জপ সম্পন্ন করা যায়।

দ্বিতীয় পর্ব: পূর্বাহ্নিক জপ (সকাল)

  • সময়: সকাল ৮:৩০ – দুপুর ১২:৩০ (৪ ঘণ্টা)
  • লক্ষ্যমাত্রা: ৩০,০০০ জপ (মোট = ৬০,০০০)
  • কৌশল: প্রাতঃকৃত্য, হালকা সাত্ত্বিক জলযোগ বা দুগ্ধপানের পর এই পর্বে বসুন। তন্দ্রা আসলে দাঁড়িয়ে বা হেঁটে হেঁটে জপ (চংক্রমণ) করুন।

তৃতীয় পর্ব: অপরাহ্নিক জপ (দুপুর ও বৈকাল)

  • সময়: দুপুর ২:০০ – বিকেল ৫:০০ (৩ ঘণ্টা)
  • লক্ষ্যমাত্রা: ২০,০০০ জপ (মোট = ৮০,০০০)
  • কৌশল: অত্যন্ত হালকা আহার গ্রহণের পর এই সময়ে শরীর কিছুটা অলস হতে পারে। তাই মানসিক জপের পাশাপাশি মুখে বা ঠোঁট নেড়ে উপাংশু জপ করুন।

চতুর্থ পর্ব: সায়াহ্ন ও নৈশ জপ (সন্ধ্যা ও রাত)

  • সময়: সন্ধ্যা ৬:০০ – রাত ৯:০০ (৩ ঘণ্টা)
  • লক্ষ্যমাত্রা: ২০,০০০ জপ (মোট = ১,০০,০০০ জপ পূর্ণ)
  • কৌশল: হাত-মুখ ধুয়ে সায়াহ্নকালে আসনে বসে জপের সমর্পণ করুন। রাত ৯টার মধ্যে ১ লক্ষ জপ সম্পন্ন করে সমর্পণ ও আসন প্রণাম সেরে বিশ্রাম নিন।

৩. ১ লক্ষ জপ অনুষ্ঠান বা ব্রতের বিশেষ নিয়মাবলী

  1. মিতাহার ও অতি-সংযম: ১ লক্ষ জপ চলার দিনগুলোতে দিনে একবার হালকা সাত্ত্বিক অন্ন বা কেবল ফল ও দুধ গ্রহণ করা উচিত। পাকস্থলী ভারী থাকলে ১ লক্ষ জপ করা প্রায় অসম্ভব।
  2. বাচিক মৌনব্রত (Silence): জপের পুরো সময়টিতে জাগতিক কথাবার্তা সম্পূর্ণ বন্ধ (মৌন) রাখুন। বাক্‌-শক্তি সঞ্চয় না করলে এত বিপুল জপের জন্য প্রয়োজনীয় তেজ পাওয়া যায় না।
  3. অজপা ও সংগৃহীত জপের যুক্তকরণ: কেবল আসনে বসে স্থির গণনার বাইরেও চলাফেরা, প্রাতঃকৃত্য বা বিশ্রামের সময় শ্বাসের সাথে অবিরাম মানসিক জপ বজায় রাখলে মূল সংখ্যার ঘাটতি দ্রুত পূরণ হয়।
  4. শारीरिक প্রস্তুতি: দীর্ঘক্ষণ বসার জন্য পিঠ ও কোমর সোজা রাখার অভ্যাস এবং প্রয়োজনে দেয়ালের হেলান বা কুশন ব্যবহার করে শরীরের ওপর অপ্রয়োজনীয় চাপ কমান।

সাধনার বার্তা: ১ লক্ষ জপের মূল চাবিকাঠি হলো ‘অবিচল নিয়ম’ এবং ‘উৎসাহ’। সংখ্যার চাপের চেয়ে পরমাত্মার প্রতি ভক্তিভাব প্রধান রেখে সময়কে সুশৃঙ্খল করাই প্রধান কৌশল।


দীর্ঘক্ষণ জপে বসার ফলে কোমর, হাঁটু বা পিঠে ব্যথা হলে সাধনা কীভাবে বজায় রাখবেন?

দীর্ঘক্ষণ একাসনে বসে জপ করার সময় পিঠ, কোমর বা হাঁটুতে ব্যথা বা অস্বস্তি হওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক শারীরিক প্রতিক্রিয়া। যোগশাস্ত্রে বলা হয়েছে—“স্থিরসুখমাসনম্” (আসন এমন হওয়া উচিত যা স্থির এবং আরামদায়ক)। শরীরকে অতিরিক্ত পীড়ন বা কষ্ট দিয়ে জপ করলে মন ঈশ্বরের নামের চেয়ে শারীরিক যন্ত্রণার দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়, যা সাধনার মূল উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করে।

দীর্ঘ জপের সময় দৈহিক যন্ত্রণা সামলে নিরবচ্ছিন্নভাবে সাধনা বজায় রাখার শাস্ত্রীয় ও ব্যবহারিক উপায়গুলো নিচে দেওয়া হলো:

১. আসন ও ভঙ্গির পরিবর্তন (Posture Adjustment)

  1. চেয়ার বা সোজা হেলান দিয়ে বসা: কোমর বা হাঁটুতে তীব্র ব্যথা থাকলে মাটিতে পদ্মাসন বা সিদ্ধাসনে বসার জোরপূর্বক চেষ্টা ছেড়ে দিন। পিঠ সোজা রেখে একটি কাঠের চেয়ারে বসুন অথবা দেয়াল/কুশনের সাপোর্ট নিয়ে পিঠ সোজা রেখে বসুন।
  2. আসন বদলানো: জপের মাঝখানে পা অবশ হয়ে গেলে বা হাঁটুতে টান ধরলে জপ না থামিয়ে ধীরগতিতে পা সোজা করে প্রসারিত করুন। স্বস্তিবোধ হলে অন্য কোনো আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসুন।
  3. প্রয়োজনীয় সাপোর্ট ব্যবহার: হাঁটুর নিচে বা নিতম্বের (Hips) নিচে একটি ছোট নরম তাকিয়া বা কুশন রাখলে মেরুদণ্ড স্বতঃস্ফূর্তভাবেই সোজা থাকে এবং কোমরের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে না।

২. চংক্রমণ জপ (হেঁটে হেঁটে জপ করা)

শাস্ত্রে একাসনে বসার পাশাপাশি ‘চংক্রমণ’ বা ধীর পায়ে চলাচলের মাধ্যমে জপ করার সম্পূর্ণ অনুমোদন রয়েছে:

  • একাসনে বসে ব্যথা অসহ্য হয়ে উঠলে আসন ছেড়ে উঠুন।
  • হাতে জপমালা বা জপ-ঝুলি নিয়ে ঘরের ভেতর বা পবিত্র প্রাঙ্গণে অত্যন্ত ধীরগতিতে হেঁটে হেঁটে জপ ও মানসিক ধ্যান চালিয়ে যান।
  • এতে পায়ে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হয়, জড়তা কাটে এবং জপের সংখ্যা বা প্রবাহও ভেঙে যায় না।

৩. কায়িক অবস্থান থেকে মানস ও শ্বাসে রূপান্তর

যন্ত্রণা যখন অতিরিক্ত রূপ নেয়, তখন শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া এবং মনকে জপে যুক্ত রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ:

  • শয়নাবস্থায় মানসিক জপ: শরীর অত্যন্ত ক্লান্ত বা ব্যথায় কাতর হলে শব আসনে (পীঠ ঠেকিয়ে শুয়ে) শুয়ে পড়ুন। চোখ বন্ধ করে শ্বাসের সাথে ইষ্টনামের মানসিক জপ বা অজপা সাধনা চালিয়ে যান।
  • পরমাত্মা সাধকের বাহ্যিক শারীরিক কসরতের চেয়ে অন্তরের আকুলতা ও ভক্তিভাবই বেশি গ্রহণ করেন।

৪. শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পূর্বপ্রস্তুতি

  • হালকা সূক্ষ্ম ব্যায়াম (Sukshma Vyayama): জপে বসার পূর্বে ২-৩ মিনিট কোমর ঘোড়ানো, হাঁটু ও গোড়ালির হালকা মোচড় এবং প্রজাপতি আসন (Butterfly Pose) করে নিলে পেশী নমনীয় থাকে।
  • জপের মাঝখানে বিরতি: ১ লক্ষ বা দীর্ঘ সময়ের জপব্রতের ক্ষেত্রে প্রতি ২-৩ ঘণ্টা অন্তর ৫-১০ মিনিটের জন্য আসন ছেড়ে একটু হাত-পা ছড়িয়ে নেওয়া ও জলপান করা শরীরকে সতেজ রাখে।

সাধনার দৃষ্টিভঙ্গি: শরীর হলো সাধনার একটি মাধ্যম বা যন্ত্র মাত্র। যন্ত্রের যত্ন নেওয়াও সাধকের দায়িত্ব। শরীরকে কষ্ট না দিয়ে বুদ্ধিমত্তার সাথে ভঙ্গি বদলে নামজপ চালিয়ে যাওয়াই প্রকৃত সুসংহত সাধনা।


জপ ও ধ্যানের সময় হঠাৎ কান্না বা ভক্তিভাবের আবেগ আসলে করণীয় কী?

জপ ও ধ্যানের সময় হঠাৎ কান্না আসাও, গায়ে কাঁটা দেওয়া (রোমাঞ্চ), শরীর শিহরিত হওয়া বা পরম আকুলতার আবেগ সৃষ্টি হওয়া সাধনমার্গের অত্যন্ত পবিত্র ও দিব্য এক লক্ষণ। শাস্ত্র এবং ভক্তিশাস্ত্রে একে ‘অশ্রুপাত’ বা ‘অশ্রু-পুলক’ বলা হয়, যা সুপ্ত ভক্তিভাব ও চেতনার শুদ্ধিকরণের প্রকাশ।

এমন আবেগ আসলে তা কীভাবে সামলাবেন এবং সাধনায় কাজে লাগাবেন, তার সূক্ষ্ম নির্দেশনা নিচে দেওয়া হলো:

১. কান্না বা আবেগকে জোর করে রোধ না করা

ধ্যানের সময় হৃদয়ে প্রীতি বা বিরহের সঞ্চার হলে এবং চোখে জল আসলে তা জোর করে চেপে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই।

  • হৃদয় উন্মুক্ত রাখা: সেই অকৃত্রিম অশ্রুকে পরমাত্মা ও গুরুর চরণে সশ্রদ্ধ নিবেদন হিসেবে বইতে দিন। এই অশ্রু সাধকের মনের জমে থাকা সূক্ষ্ম পাপ, বিকার, মল এবং অহংকারকে ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার করে দেয় (চিত্তশুদ্ধি)।
  • ভাবনা: অনুভব করুন, এই জল আপনার অন্তরের কবাট খুলে দিচ্ছে এবং ঈশ্বরকে স্পর্শ করার আকুলতা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

২. ব্যাকুলতাকে নামজপে রূপান্তরিত করা

আবেগের চোটে অনেক সময় মুখের জপ বা কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যেতে পারে। এমন অবস্থায়—

  • জপের সংখ্যা গণনার দিকে অতিরিক্ত জোর না দিয়ে সেই গভীর আকুলতা ও ভক্তিভাবের অনুভূতিতেই নিজেকে ডুবিয়ে রাখুন।
  • মুখ দিয়ে শব্দ বের না হলে অন্তরে অত্যন্ত নিবিড় মানসিক জপ চালিয়ে যান। কারণ আকুল হৃদয়ে করা মাত্র একটি মানসিক নামজপ কোটি সাধারণ জপের চেয়েও গভীর প্রভাব সৃষ্টি করে।

৩. আবেগের গভীরে হারিয়ে না গিয়ে ‘সচেতন’ থাকা

আবেগ পবিত্র হলেও সাধককে খেয়াল রাখতে হবে যেন তিনি কেবল আবেগের জোয়ারে ভেসে গিয়ে দিশেহারা না হয়ে পড়েন:

  • আবেগের চরম মুহূর্তেও অন্তরে ইষ্টনাম বা গুরুর দিব্য রূপের প্রতি সচেতনতা (Awareness) ধরে রাখুন।
  • কান্না বা শিহরণ শেষ হলে ধীর গভীর শ্বাস গ্রহণ করে পুনরায় শান্ত মনে আসনে স্থির হয়ে জপের প্রবাহে ফিরে আসুন।

৪. গোপনীয়তা বজায় রাখা

ধ্যান ও জপের সময়ের এই অশ্রু ও ভক্তিভাব হলো পরমাত্মার সাথে সাধকের একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা।

  • জপ শেষ হওয়ার পর এই অনুভূতির কথা অন্য কারও কাছে প্রকাশ করা বা প্রচার করা উচিত নয়।
  • এটি গোপন ও সুরক্ষিত রাখলে অন্তরের সাধনার শক্তি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়।

সাধনার বার্তা: চোখের জল যখন কৃত্রিমতা মুক্ত হয়ে পরমেশ্বরের ভালোবাসায় ঝরে, তখনই সাধকের হৃদয় জপের প্রকৃত ফল—’প্রেমভক্তি’ লাভের যোগ্য হয়ে ওঠে।



মালোবাবা কী?

শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবার তত্ত্বে ব্যাক্ষা: শ্রীশ্রীকাল্কি পরমেশ্বর ভগবান পরম্‌বৈষ্ণব সদ্‌গুরু মহাৠষি মালোবাবা (তাপস মালো) | শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবা। একজন যোগী, যোদ্ধা, শিল্পী, লেখক, কবি, শ্বাস্ত্রবীদ্‌,আচার্য্য, স্ব-গায়েত্রী, স্ব-যন্ত্র, স্ব-মন্ত্রের অধীকারী,সত্য শাশ্বত্‌

গুরু এবং গুরুকূল

গুরু শব্দের অর্থ, ব্যুৎপত্তি এবং গুরুকুলের বিশদ আলোচনাভারতীয় বৈদিক, উপনিষদীয় ও আধ্যাত্মিক পরম্পরায় ‘গুরু’ এবং ‘গুরুকুল’ শব্দ দুটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। গুরু কেবল একজন শিক্ষক নন; ভারতীয় জ্ঞানপরম্পরায় তিনি শিষ্যকে

নিয়ম ১.৪ !! মালোসংহীতা !! MaloSamhita !!

শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবার নিত্য নিয়ম কানুন ।নিয়ম ১.৪!!সূত্রঃ “চতুর্থুগে সমপদম্ শ্রীশ্রীকাল্কি চতুর্থুগনামং!মালোবাবায়ং প্রদও চতুর্থগনানকীর্ত্তনঃ নিত্যকুরুহং !!অর্থঃ ” শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবার প্রদত্ত চতুর্থ যুগনাম গুণকীর্তন এবং সমপদ মহাবেদ সংগীত নিত্যকর্ম্মে করা

🙏 সাবর্ণী মন্বন্তর (সাবর্ণী সত্য যুগ)🙏

সাবর্ণী মন্বন্তর ও সাবর্ণী সত্যযুগ: পুরাণের আলোকে আপনি যে ‘সাবর্ণী মন্বন্তর’ (Sāvarṇi Manvantara) এবং ‘সাবর্ণী সত্যযুগ’-এর কথা বলেছেন, সেখানে দুটি ধারণার পার্থক্য বোঝা জরুরি। পুরাণে অষ্টম মন্বন্তরের কথা স্পষ্টভাবে রয়েছে।

Shri Shri Basisthananda saraswati.✍️

🙏 Vande Malobabayong 🙏 সকল ঈশ্বর সন্তানদের প্রতি বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। সকলের জীবন মঙ্গল ও শুভযাত্রার সূচনা হোক এবং সাবর্ণী মনূষ্য ধর্ম্মের প্রারম্ভিক পর্যায়ে সকলকে মালোবাবার দশ মহাযোগ

আজকের আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত :

মিটিং উপস্থিত সাধারণ সদস্যদের অবস্থান নিচে দেওয়া হইল আজ সাবর্ণী কল্পকালের ৫৪৯ তম দিবস ২৭/০৬/০০০২ সা.ম দৈব্য বর্ষের ৬৪ তম দিবস নিত্য বৃহস্পতি বার (সময় রাত্রি ৮ঘটিকা হইতে ১০ ঘটিকা

White Card ‘সদস্যপদ’ রৌপ্যপদক প্রাপ্তি

“স্বয়ংবল গুরুকুল তপস্যার পদোন্নতি প্রাপ্তিতে প্রথম পদক ‘সাদা পদক’ বা ‘রৌপ্য পদক’ তপস্যার মূল দশটি নিয়ম পালন করে প্রাপ্তি করিতে হয় এবং স্বাধ্যায়নে পরীক্ষামূলক বা গবেষণা মূলক ভাবে অনুশীলন করিতে

নিয়ম ১.৩ !! মালোসংহীতা !! MaloSamhita !!

শ্রীশ্রীকাল্কি মহাৠষি মালোবাবার নিত্য নিয়ম কানুন ।নিয়ম ১.৩!!সূত্রঃ নিত্য মালোবাবায়ং মহাবেদ ব্রহ্মসূত্রঃ মহামন্ত্রঃ পাঠে একৈশ্বরঃ সত্য ধারণম্ !!অর্থঃ ” নিত্য মালোবাবায়ং মহাবেদ ব্রহ্মসূত্রঃ মহামন্ত্রঃ পাঠ করা এবং শ্রীশ্রীকাল্কি মালোবাবাই এক

अनुष्का यादव

श्री श्री जनक देवदासी अनुष्का ब्रह्मचारणी तपस्या – 1- तीन दिवस योग साधना (अक्षर ब्रह्म) 2- 7 दिवस योग साधना (शिव योग) शिक्षा- 10th पास श्री श्री जनक देवदासी अनुष्का

সৌমেন বিশ্বাস

শ্রীশ্রীচন্দ্রসৌমানন্দ ব্রহ্মচারী গ্রাম+ডাকঘর : ভীমপুর , থানা – ভীমপুর, জেলা -নাদিয়া , পিন – ৭৪১১৬৭ ভারতবর্ষ শিক্ষাগত যোগ্যতা: স্নাতক। তপস্যা : সপ্ত দিবস শিবযোগ দর্শন

2 thoughts on “নিয়ম ১.১ !! মালোসংহীতা !! MaloSamhita !!”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *