……… শ্রী শ্রী বশীষ্ঠানন্দ সরস্বতী ✍️
সনাতন ধর্ম্ম কী? — অর্থ, ব্যুৎপত্তি, শাস্ত্রীয় প্রমাণ ও মূল দর্শন
সনাতন ধর্ম্ম এক চিরন্তন ধর্ম্মনীতি জীবনদর্শনকে বোঝায়, যা সত্য, ন্যায়, নৈতিকতা, আত্মজ্ঞান, জীবের কল্যাণ এবং পরম সত্যের উপলব্ধির পথ নির্দেশ করে।
১. ‘সনাতন ধর্ম্ম’ শব্দের অর্থ
সংস্কৃত শব্দ দুটি দিয়ে নামটি গঠিত।
| শব্দ | সংস্কৃত | অর্থ |
|---|---|---|
| সনাতন | सनातन | চিরন্তন, অনাদি, নিত্য |
| ধর্ম্ম | धर्म | ধারণকারী নীতি, কর্তব্য, ন্যায়, শৃঙ্খলা |
সনাতন ধর্ম্ম = চিরন্তন ধর্ম্ম ওপর প্রতিষ্ঠিত জীবনপথ।
সংস্কৃত ব্যাকরণে ‘ধর্ম্ম’ শব্দটি √ধৃ (ধৃ—ধারণ করা, ধরে রাখা) ধাতুর সঙ্গে মন্ প্রত্যয়-সম্পর্কিত গঠনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। ধর্ম্ম সেই নীতি, যা ব্যক্তি ও সমাজের জীবনকে ধারণ ও নিয়ন্ত্রিত করে।
২. শাস্ত্রে ধর্ম্মের সংজ্ঞা
প্রমাণ ১: মহাভারত
বনপর্বে যক্ষ-যুধিষ্ঠির সংলাপের প্রসিদ্ধ বাণী
“ধর্ম্মো ধারয়তে প্রজাঃ।”
অর্থ: ধর্ম্ম ই প্রজাদের ধারণ করে বা সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
এই বাক্যটি ধর্ম্মের সামাজিক ও নৈতিক ভূমিকা বোঝাতে বহুল উদ্ধৃত হয়। বিভিন্ন সংস্করণে পাঠ ও অধ্যায়সংখ্যায় পার্থক্য থাকতে পারে।
প্রমাণ ২: শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ৪.৭–৮
“যদা যদা হি ধর্ম্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত…”
অর্থ: হে ভারত, যখনই ধর্ম্মের অবনতি এবং অধর্ম্মের উত্থান ঘটে, তখনই ভগবান ধর্ম্মের পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অবতীর্ণ হন।
এই শ্লোকগুলি ধর্ম্মরক্ষা অধর্মের অবসানের বৈষ্ণব ব্যাখ্যায় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
প্রমাণ ৩: শ্রীমদ্ভাগবত মহাপুরাণ ১.২.৬
“স বৈ পুংসাং পরো ধর্ম্মো যতো ভক্তিরধোক্ষজে।”
অর্থ: মানুষের পরম ধর্ম্ম সেটিই, যার দ্বারা অধোক্ষজ ভগবানের প্রতি ভক্তি লাভ হয়।
এই শ্লোকটি বিশেষভাবে ভক্তিমার্গের দৃষ্টিতে ধর্ম্মের শ্রেষ্ঠ উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করে।
৩. সনাতন ধর্ম্মে মূল ভিত্তি
১. সত্য (सत्य)
সত্য কথা বলা, সত্যকে অনুসন্ধান করা এবং নিজের আচরণে সততা বজায় রাখা।
২. অহিংসা (अहिंसा)
অকারণে কোনো জীবের ক্ষতি না করা এবং দয়া ও সহমর্মিতার চর্চা করা।
৩. জ্ঞান (ज्ञान)
শাস্ত্র অধ্যয়ন, বিচারবুদ্ধি, আত্মঅনুসন্ধান এবং সত্য-মিথ্যার পার্থক্য বোঝা।
৪. সাধনা (साधना)
যোগ, ধ্যান, জপ, তপস্যা, আত্মসংযম ও ঈশ্বরস্মরণের মাধ্যমে আত্মোন্নতি।
৫. সেবা (सेवा)
মানুষ ও জীবের কল্যাণে কাজ করা, পরোপকার এবং কর্তব্য পালন।
৪. সনাতন ধর্ম্ম কী শুধু একটি ধর্মমত?
সনাতন ধর্ম্ম সাধারণত হিন্দুধর্ম্মের একটি প্রচলিত আত্মপরিচয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে এর অর্থ ও পরিধি আরও বিস্তৃতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
এর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন দর্শন ও সাধনপথ:
- বৈদিক পথ: বেদ, যজ্ঞ, মন্ত্র ও ধর্মাচরণ।
- বৈষ্ণব পথ: বিষ্ণু, নারায়ণ, কৃষ্ণ বা রামের ভক্তি।
- শৈব পথ: শিবতত্ত্ব ও শিবসাধনা।
- শাক্ত পথ: দেবী, শক্তি ও তন্ত্রসাধনা।
- যোগ ও জ্ঞানমার্গ: আত্মসংযম, ধ্যান, আত্মজ্ঞান ও মুক্তির অনুসন্ধান।
এই ধারাগুলির দর্শন ও উপাসনাপদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। সব ধারার সব মতবাদ একই নয়।
৫. সনাতন ধর্ম্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য কী?
বিভিন্ন সনাতন দর্শনে চূড়ান্ত লক্ষ্য বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে:
- মোক্ষ: জন্ম-মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি।
- আত্মজ্ঞান: আত্মার প্রকৃত স্বরূপ উপলব্ধি।
- ভগবৎপ্রাপ্তি: ভগবানের উপলব্ধি বা তাঁর সঙ্গে নিত্য সম্পর্ক লাভ।
- ধর্ম্মময় জীবন: সত্য, ন্যায়, সংযম ও কল্যাণের পথে চলা।
অদ্বৈত বেদান্ত, বিশিষ্টাদ্বৈত, দ্বৈত এবং বিভিন্ন ভক্তি-সম্প্রদায় মুক্তি ও ঈশ্বর-জীবের সম্পর্ক সম্পর্কে পৃথক ব্যাখ্যা দেয়।
৬. একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য
‘সনাতন ধর্ম্ম’ কথাটির প্রাচীন শাস্ত্রীয় ব্যবহার এবং বর্তমান সময়ে সনাতন ধর্ম্ম সামগ্রিক পরিচয় হিসেবে এর ব্যবহার—দুটি সম্পর্কিত হলেও একেবারে অভিন্ন ঐতিহাসিক বিষয় নয়। তাই কোনো নির্দিষ্ট মতবাদকে সনাতন ধর্ম্মের একমাত্র ব্যাখ্যা বলে ধরে নেওয়ার আগে তার শাস্ত্রীয় ও দার্শনিক ভিত্তি পরীক্ষা করা উচিত।
সংক্ষেপে: সনাতন ধর্ম্ম চিরন্তন সত্য, ধর্মাচরণ, আত্মজ্ঞান, ঈশ্বরসাধনা ও জীবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত একটি বিস্তৃত ধর্ম্মীয় -দার্শনিক ঐতিহ্য।

